আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও দিবসটি আমাদের সামনে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে—গণমাধ্যম কতটা স্বাধীন, কতটা দায়িত্বশীল, এবং কতটা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে সক্ষম? এবারের প্রতিপাদ্য ‘শান্তিময় ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ’ এবং বাংলাদেশের নির্ধারিত থিম ‘জবাবদিহি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম’—দুটিই বর্তমান বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে।
গণমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এই স্তম্ভ তখনই কার্যকর থাকে, যখন এটি একইসঙ্গে স্বাধীন এবং দায়িত্বশীল হয়। স্বাধীনতা ছাড়া সত্য বলা যায় না, আর দায়িত্বশীলতা ছাড়া সেই সত্য জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারে না। ফলে গণমাধ্যমের এই দ্বৈত ভূমিকা—স্বাধীনতা ও জবাবদিহি—আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব সংবাদ পরিবেশনে অভূতপূর্ব গতি এনেছে। কিন্তু এই গতি যেমন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন এক সংকট—অপতথ্য বা ডিসইনফরমেশন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম চাঞ্চল্যকর ও আবেগনির্ভর কনটেন্টকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, যেখানে সত্যতা যাচাই প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। ফলে মিথ্যা খবর অনেক সময় সত্যের আগেই মানুষের কাছে পৌঁছে যায় এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তি অপতথ্যের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ছবি, ভিডিও কিংবা অডিও—সবই এখন সহজে বিকৃত করা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা, ক্লিকবেইট সংস্কৃতি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব ছড়ানোর প্রবণতা। ফলে অপতথ্য এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্যও বড় হুমকি।
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ অনলাইনে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক সময়ে অপতথ্যের বিস্তার এবং এর সামাজিক প্রভাব আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। এমন প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—কারণ বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের শেষ আশ্রয়স্থল এখনও মূলধারার সাংবাদিকতাই।
এখানেই আসে জবাবদিহির প্রশ্ন। একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না; এটি ক্ষমতার ওপর নজরদারি রাখে, প্রশ্ন তোলে এবং জনগণের পক্ষে সত্য তুলে ধরে। যেখানে গণমাধ্যম স্বাধীন নয়, সেখানে জবাবদিহি ভেঙে পড়ে। আবার যেখানে গণমাধ্যম দায়িত্বজ্ঞানহীন, সেখানে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
অতএব, অপতথ্যের এই যুগে সাংবাদিকতার মূল শক্তি হতে হবে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা এবং তথ্য যাচাইয়ের কঠোরতা। সংবাদ প্রকাশের আগে উৎস যাচাই, ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে—যাতে তারা যাচাইবিহীন কোনো তথ্য শেয়ার না করেন।
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের ভেতরে শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং কাঠামো গড়ে তোলা এবং সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন এবং সত্য প্রকাশে কোনো বাধার সম্মুখীন না হন।
শেষ পর্যন্ত একটি বিষয় স্পষ্ট—অপতথ্যের এই স্রোতের মধ্যে সত্যকে টিকিয়ে রাখা সহজ নয়, কিন্তু তা অপরিহার্য। কারণ গণমাধ্যম শুধু খবরের বাহক নয়, এটি সমাজের আয়না। সেই আয়না যদি ঝাপসা হয়ে যায়, তবে সমাজও নিজের প্রতিচ্ছবি হারাবে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকা। অপতথ্যের অন্ধকার ভেদ করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং শান্তিময় ভবিষ্যৎ নির্মাণই হোক আমাদের লক্ষ্য।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com