[caption id="attachment_18578" align="alignnone" width="300"]
রাষ্ট্রের চার স্তম্ভের স্বাধীনতাই আগামীর বাংলাদেশের ভিত্তি[/caption]
সম্পাদকীয়
একটি রাষ্ট্রের শক্তি কেবল তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা, স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতার ওপর। যে রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব স্বাধীনভাবে পালন করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রা আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি নাগরিকদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। জনগণ এখন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখতে চায়, যেখানে প্রশাসন প্রশাসনের কাজ করবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন প্রয়োগে নিবেদিত থাকবে, বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে এবং গণমাধ্যম সত্য ও জনস্বার্থের পক্ষে নির্ভয়ে কাজ করবে। রাষ্ট্রের এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাদের স্বাধীন অবস্থান ও সাংবিধানিক সীমারেখাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো ক্ষমতার ভারসাম্য। যখন কোনো একটি প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি অতিক্রম করতে শুরু করে, তখন সেই ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি অঙ্গের নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে; সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে দায়িত্বের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে গেলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয় এবং সুশাসনের পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষভাবে গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কেবল তথ্য পরিবেশন করে না; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আত্মসমালোচনার আয়না হিসেবেও কাজ করে। ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো সাধারণত নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে আগ্রহী থাকে; কিন্তু ভুল, দুর্বলতা ও ব্যর্থতার বিষয়গুলো প্রকাশ পায় অনুসন্ধানী ও স্বাধীন সাংবাদিকতার মাধ্যমে। ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধার বিষয় নয়; এটি জনগণের জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার অন্যতম পূর্বশর্ত।
একইভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা একটি সভ্য রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হলে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান নিশ্চয়তা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং প্রশাসনের দক্ষতা রাষ্ট্রের কার্যকারিতার অপরিহার্য উপাদান। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন বাস্তবায়ন করা এবং জনসেবা প্রদান করা—এসব ক্ষেত্রেই তাদের নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কোনো প্রতিষ্ঠানই এককভাবে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না; বরং প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানকে তার নির্ধারিত দায়িত্ব ও সীমারেখার মধ্যে থেকেই সর্বোচ্চ দক্ষতা প্রদর্শন করতে হয়।
আজকের বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উন্নয়নের পাশাপাশি আমাদের সামনে রয়েছে সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি দমন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যক্তি নয়, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তম্ভ নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকবে; যেখানে সত্য বলার স্বাধীনতা থাকবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে এবং জনগণের স্বার্থই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ মানদণ্ড। রাষ্ট্রের চার স্তম্ভের স্বাধীনতা ও কার্যকর সমন্বয়ের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
আগামীর বাংলাদেশ গড়ার পথে এটাই হওয়া উচিত আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com