পুলিশের চাকরিটা বড় বিচিত্র। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রায়ই এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে দুপক্ষকে সন্তুষ্ট করার কোনো সুযোগ থাকে না। একজনের প্রত্যাশা পূরণ করতে গেলে অন্যজনের মুখে হতাশার ছাপ পড়ে। কারণ, সত্য সব সময় সবার পক্ষে যায় না, আর ন্যায়বিচারও সব সময় ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে মেলে না।
একটি মামলার তদন্তে কখনো বাদীর অভিযোগের সত্যতা উঠে আসে, কখনো বিবাদীর নির্দোষিতার প্রমাণ পাওয়া যায়, আবার কখনো প্রকাশ পায় এমন কিছু অজানা তথ্য, যা উভয় পক্ষের ধারণাকেই ভুল প্রমাণ করে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিজের প্রত্যাশার বিপরীতে গেলে অনেকেই সত্যকে মেনে নেওয়ার পরিবর্তে তদন্তকারী কর্মকর্তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কেউ পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেন, কেউ আবার প্রভাব খাটিয়ে নিজের অনুকূলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—পুলিশের প্রতিটি সিদ্ধান্ত কি কেবল অভিযোগকারী কিংবা অভিযুক্তের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে মূল্যায়িত হবে, নাকি সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি, প্রক্রিয়া ও আইনসম্মত যথার্থতাও বিবেচনায় নেওয়া হবে?
পুলিশের কাজ সবাইকে খুশি করা নয়; কিন্তু নিজের প্রতিটি কাজের জন্য আইন ও বিধি অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা অবশ্যই দায়িত্বের অংশ।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন দাবি করলেই তা চূড়ান্ত সত্য হয়ে যায় না। তাঁর সিদ্ধান্তের পেছনে কী তথ্য-প্রমাণ ছিল, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আইনসম্মত সুযোগ পেয়েছে কি না এবং কোনো অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ ও যুক্তিসংগত উত্তর থাকতে হবে। কারণ, নিরপেক্ষতা শুধু ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বিষয় নয়; এটি কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করার বিষয়।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে, কোনো পক্ষের অভিযোগ উঠলেই একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হবে নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায়, প্রমাণের ভিত্তিতে এবং ন্যায়সংগত পদ্ধতিতে। যেমন কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন, তেমনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অযৌক্তিক চাপ, মিথ্যা অভিযোগ কিংবা হয়রানির শিকার হলেও তাঁর ন্যায়সংগত সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। জবাবদিহি মানে একতরফা দোষারোপ নয়; বরং সবার জন্য একই নীতি ও ন্যায্য প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
ক্ষমতা পুলিশের দায়িত্ব পালনের উপকরণ, ব্যক্তিগত ইচ্ছা বাস্তবায়নের অধিকার নয়। আইন প্রয়োগের ক্ষমতা যত বেশি, সেই ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্বও তত বেশি। তাই কোনো তদন্তে প্রভাব, প্রলোভন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক চাপ কিংবা প্রতিহিংসা যেন সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়ে একজন কর্মকর্তাকে সচেতন থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব হলো কার্যকর তদারকি, অভিযোগ নিষ্পত্তির নিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
এখানে জবাবদিহির অর্থ শুধু ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া নয়। এর অর্থ হলো—আইনের কাছে দায়বদ্ধ থাকা, নাগরিকের বৈধ অধিকারকে সম্মান করা, সিদ্ধান্তের যথার্থতা ব্যাখ্যা করতে প্রস্তুত থাকা এবং ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া। কোনো কর্মকর্তা সৎ উদ্দেশ্যে কাজ করলেও তাঁর কাজে ভুল হতে পারে; পেশাগত সততার পরিচয় হলো সেই ভুল আড়াল করা নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিকভাবে তা সংশোধন করা।
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষেরও বোঝা প্রয়োজন—নিজের প্রত্যাশামতো ফল না পেলেই কোনো তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যায় না। অভিযোগের ভিত্তি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের প্রয়োগ বিবেচনা না করে তদন্তকারীকে অভিযুক্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি পুলিশের পদমর্যাদা বা ক্ষমতার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও বিপজ্জনক। পুলিশের প্রতি আস্থা অন্ধ আনুগত্যের মাধ্যমে নয়, বরং স্বচ্ছতা, ন্যায়সংগত আচরণ ও কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা দিনের দায়িত্ব শেষে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে চাইবেন—“আমি কোনো পক্ষের প্রতি অনুরাগ কিংবা বিরাগ থেকে সিদ্ধান্ত নিইনি। তথ্য-প্রমাণকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করিনি। কাউকে অন্যায়ভাবে হয়রানি করিনি, আবার কারও প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করে অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টাও করিনি। আমার সিদ্ধান্তের পক্ষে আইনসম্মত যুক্তি রয়েছে, আর আমার কাজের জবাব দিতে আমি প্রস্তুত।”
তবে বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকাই যথেষ্ট নয়; নাগরিকের অধিকার, আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির প্রতিও দায়বদ্ধ থাকতে হবে। কারণ, ব্যক্তিগত সততা একজন কর্মকর্তার নৈতিক শক্তি, আর কার্যকর জবাবদিহি সেই সততাকে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতায় রূপ দেয়।
পদমর্যাদা মানুষকে পরিচিতি দেয়, ক্ষমতা দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়, কিন্তু সততা ও জবাবদিহি সেই ক্ষমতাকে মানুষের আস্থায় পরিণত করে। একজন প্রকৃত পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তার সার্থকতা সবার প্রশংসা অর্জনে নয়; বরং আইন মেনে দায়িত্ব পালন, নিরপেক্ষ তদন্ত, নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং নিজের প্রতিটি কাজের জন্য ন্যায়সংগত জবাব দিতে প্রস্তুত থাকার মধ্যে।
পুলিশকে যেমন অন্যায় চাপের কাছে নতি স্বীকার করা যাবে না, তেমনি পুলিশকেও আইনের ঊর্ধ্বে ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন আইন প্রয়োগকারী ব্যক্তি নিজেও আইনের প্রতি সমানভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। আর যে পুলিশ সততার সঙ্গে ক্ষমতা প্রয়োগ করে, স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে এবং জবাবদিহিকে দুর্বলতা নয়, পেশাগত মর্যাদা হিসেবে গ্রহণ করে—সেই পুলিশই প্রকৃত অর্থে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com