গাজীপুরের শ্রীপুরে আশ্রয় দেওয়ার কথা বলে দুই শিশুসন্তানের সামনে ২৫ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে সোহরাব হোসেন নামের এক পানদোকানির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নারীর দাবি, গত মঙ্গলবার রাতে মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী নারী বলেন, প্রায় এক বছর আগে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। বাসাভাড়া বকেয়া থাকায় গত মঙ্গলবার দুপুরে জৈনা বাজার এলাকার বাসা থেকে তাকে বের করে দেন বাড়ির মালিক। পরে দুই সন্তান নিয়ে তিনি মাওনা চৌরাস্তা এলাকার উড়ালসেতুর নিচে ফুটপাতে আশ্রয় নেন
অভিযোগের পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিচার চেয়েও প্রতিকার না পাওয়ার দাবি করেছেন ওই নারী। পরে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় বাসের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে একটি পানের আড়তে নিয়ে যান।
খবর পেয়ে শ্রীপুর থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগী নারী ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে। পরে ওই নারী বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলমান।
ভুক্তভোগী নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া থাকায় মঙ্গলবার রাতে বাড়ির মালিক তাঁকে দুই সন্তানসহ ঘর থেকে বের করে দেন। এরপর সন্তানদের নিয়ে তিনি মাওনা চৌরাস্তার উড়ালসড়কের নিচে অবস্থান করছিলেন।
এ সময় সোহরাব হোসেন নামের এক পানদোকানি তাঁর সমস্যার কথা জানতে চান। আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলে তাঁকে চৌরাস্তার পূর্ব পাশে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ওই নারী।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ঘটনার সময় তাঁর দুই সন্তান কাছাকাছি ছিল। তিনি কান্নাকাটি করলেও অভিযুক্ত তাঁকে ছাড়েননি বলে দাবি তাঁর।
[caption id="attachment_19786" align="alignright" width="502"] সন্তানদের সামনে মাকে নির্যাতনের অভিযোগ—ঘটনার পর এলাকায় চাঞ্চল্য[/caption]
ঘটনার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিচার চেয়েছিলেন বলে জানান ওই নারী। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় কয়েকজন বিষয়টি মীমাংসার পরিবর্তে তাঁকে ৫০০ টাকা দিয়ে চলে যেতে বলেন।
এরপর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় বাসের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন তিনি। স্থানীয়রা তাঁকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করেন।
শুক্রবার দুপুরে মাওনা চৌরাস্তার পানের আড়তে গিয়ে দেখা যায়, এক শিশুকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ওই নারী। সেখানে শ্রীপুর থানা-পুলিশের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি বারবার নিজের ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বিচার দাবি করেন। শ্রীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম এই অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।এর আগে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে শ্রীপুর পৌরসভার মাওনা চৌরাস্তা এলাকার পানের আড়তসংলগ্ন স্থানে এ ঘটনা ঘটে।ভুক্তভোগী শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের বাসিন্দা।অভিযুক্ত সোহরাব হোসেন (৩৫) নেত্রকোনা জেলার বাসিন্দা এবং মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় পান ব্যবসা করেন।পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
[caption id="attachment_19784" align="alignleft" width="592"] বিচার না পেয়ে বাসের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা—শ্রীপুরে নারী নিরাপত্তা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন[/caption]
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শফিকুল জানান, পানের আড়তের পাশে সোহরাব নামের এক ব্যক্তি একটি পানদোকান চালাতেন। বর্তমানে তাঁর দোকান বন্ধ রয়েছে।
অভিযুক্ত সোহরাব হোসেনের বাড়ি নেত্রকোনায় বলে জানা গেছে। ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম জানিয়েছেন, এ ঘটনায় একজনকে আসামি করে ধর্ষণের মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ভুক্তভোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
একজন অসহায় নারী অভিযোগ করেছেন, আশ্রয়ের কথা বলে তাঁকে নির্জন স্থানে নিয়ে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। এরপর স্থানীয় পর্যায়ে বিচার না পাওয়ার অভিযোগে তিনি দুই সন্তানসহ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। ঘটনাটি শুধু একটি ফৌজদারি অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি একই সঙ্গে অসহায় নারীর নিরাপত্তা, স্থানীয়ভাবে অভিযোগের প্রতিকার, প্রত্যক্ষদর্শী বা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভূমিকা এবং দ্রুত আইনগত সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
দৈনিক অপরাধচক্রের অনুসন্ধানের প্রশ্ন—একজন নারী নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর পর কেন তাঁকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে যেতে হলো? স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর অভিযোগকে যথাযথভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব কি কেউ নিয়েছিল?
ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে দ্রুত, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের জবাবদিহি আরও স্পষ্ট হয়। তবে একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা না করে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়াকে সম্মান করাও জরুরি।
দৈনিক অপরাধচক্রের দাবি:
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর আইনি সহায়তা, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা, দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। অপরাধী যে-ই হোক, আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com