কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিজ্ঞ বিচারক জনাব মোহাম্মদ আবদুল হান্নান আজ একটি চাঞ্চল্যকর অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। রায়ে, ২৭ বছর বয়সী আসামি সোলেমানকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করা হয়েছে। এই রায়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার সদর উপজেলার খরুলিয়া এলাকার সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করা হয়। মেয়েটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পড়ত। ওইদিন সে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে অপহৃত হয়। এই ঘটনার পর তার পরিবার স্থানীয় থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করে। তদন্ত চলাকালে জানা যায়, সোলেমান নামের এক যুবক তাকে অপহরণ করেছে। অপহরণকারী সোলেমান মেয়েটির প্রতিবেশী। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, সোলেমান দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটিকে উত্ত্যক্ত করে আসছিল। এই কারণে এর আগেও তার পরিবারের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল।
অপহরণের দুই দিন পর, ২০ ডিসেম্বর, নিখোঁজ মেয়েটির বস্তাবন্দি মরদেহ পার্শ্ববর্তী একটি পরিত্যক্ত পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নিশ্চিত হয় যে, মেয়েটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। মরদেহটি এমনভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল যাতে তা সহজে কারও চোখে না পড়ে। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং অপরাধীর কঠোর শাস্তির দাবিতে স্থানীয়রা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করে।
পুলিশ এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত শুরু করে এবং প্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে সোলেমানকে গ্রেপ্তার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে তার অপরাধের কথা স্বীকার করে। পরবর্তীতে, পুলিশ সোলেমানের বিরুদ্ধে অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে একটি পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট আদালতে জমা দেয়।
আদালতের দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায়, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এবং প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত নিশ্চিত হয় যে সোলেমান একাই এই জঘন্য অপরাধ করেছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়। আদালত রায় ঘোষণার সময় উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের অপরাধ সমাজে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে এবং নারী ও শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য মারাত্মক হুমকি। তাই, এমন অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের জঘন্য কাজ করার সাহস না পায়।
এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা এবং মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের মতে, এই রায় সমাজে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে যে, নারী ও শিশু নির্যাতনকারীরা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, এই রায়টি সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমাতে এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে। রায়ের পর নিহত ছাত্রীর পরিবার ও স্থানীয়রা আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেছেন যে তারা ন্যায়বিচার পেয়েছেন।
এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকলেও, এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক রায় হিসেবে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com