ভোলার আলোচিত মুহাদ্দিস ও জনপ্রিয় আলেম মাওলানা আমিনুল ইসলাম নোমানী হত্যার ঘটনায় অবশেষে রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে তার বড় ছেলে রেদওয়ানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দীর্ঘ সাতদিন ধরে তদন্তের পর অবশেষে পুলিশ এ ঘটনায় অগ্রগতি আনতে সক্ষম হয়েছে।
গত সপ্তাহে নিজ বাসায় মাওলানা আমিনুল ইসলাম নোমানীকে হত্যা করা হয়। প্রথম দিকে পুলিশ ও স্থানীয়রা ধারণা করেছিলেন, হয়তো কোনো সন্ত্রাসী বা দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করেছে। কিন্তু দিন গড়ানোর পরও হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কোনো আলামত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে এলাকাজুড়ে তীব্র আলোড়ন ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
ঘটনার প্রায় সাত দিন পর গতকাল রাতে নিহত নোমানীর বড় ছেলে রেদওয়ানকে আটক করে পুলিশ। প্রেস ব্রিফিংয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, পরিবারের দেওয়া তথ্য ও প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে—পিতার হাতে দীর্ঘদিনের শাসন-ভর্ৎসনার কারণে ক্ষোভে ফেটে পড়ে এই ঘটনা ঘটায় রেদওয়ান।
নিহতের স্ত্রী তথা রেদওয়ানের মা পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তিনি জানান, রেদওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই উশৃঙ্খল আচরণ করছিল। পড়ালেখায় মনোযোগ না দিয়ে দিনরাত ফোনে ফ্রি ফায়ার ও পাবজি খেলত। এসব নিয়ে তার বাবার সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া হতো।
[video width="720" height="1280" mp4="https://dailyaparadhchakra.com/wp-content/uploads/2025/09/Police-aporadhchakra.mp4"][/video]
তিনি আরও জানান, ঘটনার কিছুদিন আগেই রেদওয়ানকে নিয়ে পরিবারের মধ্যে বড় ধরনের বাকবিতণ্ডা হয়। এমনকি যে দিন হত্যাকাণ্ড ঘটে, সেদিন বিকাল থেকেই রেদওয়ান বাড়িতে ছিল না। এসব তথ্য পুলিশকে সন্দেহ দৃঢ় করতে সাহায্য করে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মাওলানা আমিনুল ইসলাম নোমানী ছিলেন অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ মানুষ। পরিবার ও ছাত্রদের সর্বদা সঠিক পথে চলার নির্দেশ দিতেন। রেদওয়ানের অমনোযোগিতা, সারাক্ষণ মোবাইল গেমস খেলা এবং বেপরোয়া চলাফেরা নিয়ে তিনি বিরক্ত ছিলেন। প্রায়ই ছেলেকে শাসন করতেন। এ থেকেই ছেলের মনে ক্ষোভ জমে উঠেছিল বলে ধারণা পুলিশের।
নিহতের জানাজায় রেদওয়ানের আচরণ নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন। স্থানীয়রা বলেন, জানাজায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তার মুখে কিংবা চোখে বাবাকে হারানোর কষ্টের কোনো ছাপ ছিল না। এই আচরণও পরিবারের সন্দেহকে আরও দৃঢ় করে।
সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দেয় নিহতের স্ত্রীর অবস্থান। তিনি সরাসরি বলেন, “যদি সত্যিই আমার ছেলে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে, তাহলে আমি তার ফাঁসি চাই।” নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে এ ধরনের অবস্থান সমাজে বিরল। তবে একজন মায়ের এমন বক্তব্যে প্রমাণ হয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সবকিছু মেনে নিতে প্রস্তুত।
পুলিশ জানিয়েছে, আটক রেদওয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হবে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পরিকল্পনা এবং ঘটনার পূর্বাপর তথ্য খুঁজে বের করতে তারা বিস্তারিত তদন্ত চালাবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন- এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নোমানীকে হত্যার পেছনে পারিবারিক কলহই প্রধান কারণ। তবে আমরা সবদিক খতিয়ে দেখছি।
এ ঘটনা ভোলা ও আশপাশের এলাকায় চরম আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একজন আলেম, যিনি সমাজে নৈতিকতার বার্তা প্রচার করতেন, তিনি যদি ছেলের হাতে খুন হন—এটা মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। এলাকাবাসীর দাবি, দোষী প্রমাণিত হলে রেদওয়ানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
একজন জনপ্রিয় আলেম ও শিক্ষকের জীবননাশের ঘটনায় অবশেষে রহস্য উন্মোচিত হলো। বাবা-ছেলের সম্পর্কের টানাপোড়েন যে এমন ভয়াবহ পরিণতি আনতে পারে, তা অনেকের কাছেই অকল্পনীয়। এখন সবার দৃষ্টি পুলিশের তদন্ত ও আদালতের বিচারের দিকে। সমাজের মানুষ আশা করছে, এই মামলার দ্রুত বিচার হবে এবং এর মাধ্যমে অন্যদের জন্যও শিক্ষা তৈরি হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com