বাংলাদেশের কোম্পানি অফিস বা পত্রিকার অফিসে কর্মীরা সারাদিন কাজ করে ঘাম ঝরিয়ে দিলেও মাস শেষে বেতনের অপেক্ষায় দিন কাটান। দু-তিন মাস ধরে "আজ দেবো, কাল দেবো" বলে আশ্বাস দিয়ে চলা হয়, যা শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, মানসিক যন্ত্রণারও কারণ।
সকালে অফিসে এসে দুপুরের খাবারের অভাবে অনাহারে কাজ করতে হয়; কোনোদিন তিন-চারটায় পেলেও বেশিরভাগ সময় চার-পাঁচটার পর রুটি খেয়ে দিন শেষ করতে হয়। এমন অমানবিক পরিস্থিতি যেন কর্মীদের মর্যাদা হরণ করছে। বিশেষ করে পত্রিকার নিউজ এডিটর বা স্টাফরা, যারা সমাজের সচেতনতা ছড়ান, তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হবে কীভাবে? এই সমস্যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, সমাজের নৈতিকতা ও আইনের লঙ্ঘনের প্রশ্ন।
ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবহেলা অগ্রহণীয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কর্মীর মজুরি দাও তার ঘাম শুকানোর আগেই।" এই হাদিস (ইবনে মাজাহ) কর্মপতির দায়িত্বকে স্পষ্ট করে যে, বেতনের দেরি কর্মীর জীবনকে কষ্টদায়ক করে তোলে এবং এটি পাপের কাজ। ইসলাম শ্রমিকের অধিকারকে জোরালো করে বলে যে, ন্যায়বান মজুরি সময়মতো দেওয়া উচিত, যাতে কর্মী তার পরিবারের ভরণপোষণ করতে পারে। দেরি করলে কর্মপতি আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে। এই নীতি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে, যা আজকের কর্মক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গভীর অন্যায়। একজন কর্মী সারাদিন পরিশ্রম করে অনাহারে ফিরলে তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খাবারের অভাব বা রুটি-ভাতের বৈষম্য যেন মানুষকে পশুর মতো ব্যবহার করে। সমাজের প্রতিটি সদস্যের মৌলিক অধিকার হলো সম্মানজনক জীবনযাপন, যা বেতনের দেরি ও খাদ্য অভাব লঙ্ঘন করে। এতে কর্মীরা হতাশায় পড়ে, পরিবারে অশান্তি ছড়ায় এবং উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কর্মপতিদের উচিত বুঝতে হবে যে, কর্মী ছাড়া ব্যবসা চলে না; তাদের সুখই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের চাবিকাঠি।
এই অবহেলা মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্পষ্ট উদাহরণ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর কনভেনশন ৯৫ (প্রটেকশন অফ ওয়েজেস) অনুসারে, বেতনের দেরি বা অ-পেমেন্ট কর্মীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে, যা জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৩ নং অনুচ্ছেদের (কাজের অধিকার) সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ILO-এর বিশেষজ্ঞ কমিটি (CEACR) এই ধরনের দেরি বা অপ্রতুলতাকে শ্রম অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা কর্মীদের দারিদ্র্যে ঠেলে দেয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। বাংলাদেশে এমন ঘটনা বাড়লে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে, যা দেশের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬-এর ধারা ১২১ অনুসারে, বেতন সপ্তাহের মধ্যে (সাত কার্যদিবসের মধ্যে) দিতে হবে, অন্যথায় জরিমানা বা শাস্তি হবে। ধারা ১৩৪-এ সমান কাজের জন্য সমান মজুরির কথা বলা হয়েছে, এবং অননুমোদিত কাটতি নিষিদ্ধ। খাবারের বিষয়ে ধারা ৯১-৯৩-এ ক্যান্টিন ও ওয়েলফেয়ার প্রভিশন আছে, যা কর্মপতিকে সুষম খাদ্য প্রদানের দায়িত্ব দেয়। লঙ্ঘন হলে এক বছরের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
এর সমাধান হিসেবে কর্মপতিদের উচিত বেতনের নিয়মিততা নিশ্চিত করা, খাবারের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং শ্রম বিভাগের তত্ত্বাবধানে নিয়ম মেনে চলা। সরকারি উদ্যোগে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে। কর্মীরা ইউনিয়ন গঠন করে অধিকার দাবি করুক। এতে শুধু কর্মী নয়, সমাজও উন্নত হবে। সময় এসেছে এই অমানবিকতা বন্ধ করে ন্যায়ের পথে এগোনোর।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com