ভালোবাসার স্বপ্নে পাকা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যে কিশোরী নববধূর জীবন শুরু হয়েছিল, দেড় মাস না পার হতেই তা নির্যাতনের কালো ছায়ায় ঢেকে যায়। ঢাকার নবাবগঞ্জে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মাত্র ১৫ বছরের ফাহিমা আক্তার নামের এক কিশোরী লাশ হয়ে ফিরে এসেছে তার পরিবারের কোলে।
শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর দুইটার দিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং সমাজে নারী নির্যাতনের গভীর সমস্যার স্মৃতি সতর্ক করে।
ফাহিমা আক্তার ছিলেন বান্দুরা ইউনিয়নের বারদুয়ারি গ্রামের মো. হাসান বেপারীর কন্যা। প্রায় দেড় মাস আগে, ভালোবাসার টানে তিনি নয়নশ্রী ইউনিয়নের দেওতলা গ্রামের খায়রুল ইসলাম স্বপনের সন্তান সামিরুল ইসলাম সম্রাটের (২৫) সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। সম্রাট বান্দুরা বাজারে একটি কাপড়ের দোকানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। বিয়ের প্রথমদিনগুলো যেন স্বপ্নের মতো ছিল, কিন্তু সেই স্বপ্ন শীঘ্রই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ফাহিমার পরিবারের মতে, বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই যৌতুকের অবৈধ দাবিতে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বেড়ে চলে, যা ফাহিমার কচি হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে।
শুক্রবার দুপুরে ফোনের মাধ্যমে ফাহিমার পরিবারকে জানানো হয় যে, তাকে অসুস্থ অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তাড়াহুড়ো করে হাসপাতালে পৌঁছে তারা যা দেখলেন, তা ছিল অকল্পনীয় তাদের প্রিয় ফাহিমা আর বেঁচে নেই। মা জেসমিন আক্তার রূপা চোখের জলে ভেঙে পড়ে বলেন, “ওরা আমার মেয়েকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। আমি এই হত্যার পূর্ণ বিচার চাই, যাতে আমার মতো কোনো মা আর এমন কষ্ট না পান।” ফাহিমার বয়স মাত্র ১৫, যা বাংলাদেশের আইনত বাল্যবিবাহের সীমা অতিক্রম করে। এই বিয়ে নিজেই একটি সামাজিক অপরাধ, যা পরবর্তীকালে তার জীবনকে আরও বিপন্ন করে তোলে।
এই ঘটনায় নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ দ্রুত অ্যাকশন নিয়েছে। ফাহিমার শ্বশুরবাড়ির লায়লা খাতুন (৪৫) এবং স্বামী সামিরুল ইসলাম সম্রাটকে আটক করা হয়েছে। থানার অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) মমিনুল ইসলাম জানান, “মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রমাণ সংগ্রহ করছি। আইনি প্রক্রিয়া অনুসারে মামলা দায়ের হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি চিকিৎসা অবহেলারও প্রশ্ন উঠেছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের সমাজে বাল্যবিবাহ, যৌতুক নির্যাতন এবং নারী অধিকারের লঙ্ঘনের গভীর সমস্যাকে উন্মোচিত করেছে। প্রতি বছর শত শত নারী এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারান, কিন্তু বিচারের অভাবে অপরাধীরা প্রায়ই ধারাবাহিকতা ছাড়াই পার পেয়ে যায়। ফাহিমার মতো কিশোরীদের স্বপ্নগুলো যেন এই অন্ধকারে হারিয়ে যায় না এমন সচেতনতা দরকার। সরকারি-অরাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে এখন আরও সক্রিয় হয়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। ফাহিমার পরিবার এবং স্থানীয় সাংবাদিক সূত্র থেকে জানা গেছে, এই ঘটনায় এলাকাবাসীরা প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দ্রুত বিচারের দাবি তুলেছে।
ফাহিমার চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, বরং সমগ্র সমাজের জন্য একটি সতর্কবাণী। তার মতো আর কোনো মেয়ে ভালোবাসার নামে জীবনের অন্ধকারে ডুবে না যায় এই প্রত্যাশা নিয়ে আমরা সকলে দায়িত্বশীল হই। পুলিশের তদন্তের ফলাফল কী হবে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সকলে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com