লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ধবলসতী মৌজার রহমতপুর বাঁশবাড়ি সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশি নাগরিকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে দুইটি গরু লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষকরা আহত হলেও গ্রামবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে বিএসএফ সদস্যরা বন্দুক উঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে সরে যায়। শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুর ৩টার দিকে উপজেলার ৮৩০ নম্বর মেইন পিলারের এস-৫ সাব-পিলার সংলগ্ন এলাকায় এই অমানবিক ঘটনা ঘটে, যা সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্র অনুসারে, বাঁশ ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম (৩০) এবং জয়নাল হোসেন (২৫) দুপুরে সীমান্তের কাছে বাঁশ কাটছিলেন। হঠাৎ বিএসএফের একদল সদস্য সেখানে হানা দিয়ে তাদের ওপর লাঠি-হাতড়া নিয়ে হামলা করে। রাশেদুলের মতে, “আমরা শান্তভাবে কাজ করছিলাম, কিন্তু তারা কোনো কথা না বলে আক্রমণ শুরু করল। আমরা পালাতে গিয়ে পড়ে যাই এবং শরীরে বেশ কয়েকটি আঘাত লাগে।” জয়নালও বলেন, “তাদের হাতে অস্ত্র দেখে আমরা ভয়ে কাঁপছিলাম। গ্রামের লোকজন না আসলে জানেই কী হতো।
হামলার খবর পেয়ে গ্রামবাসীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তাদের উপস্থিতিতে বিএসএফ সদস্যরা বন্দুক তুলে ভীতি সৃষ্টি করে, কিন্তু গ্রামবাসীদের সাহসী প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে সরে যাওয়ার আগে তারা স্থানীয় কৃষক জবেদ আলী এবং শাহাবুদ্দিনের দুইটি মূল্যবান গরু জোর করে নিয়ে যায়। এই গরুগুলো ছিল স্থানীয়দের জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দুধ উৎপাদন এবং চাষাবাদে সাহায্য করে। গ্রামবাসী সেলিম রেজা জানান, “সীমান্তের জিরো লাইনে গরু চরানো এবং ঘাস খাওয়ানোকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, কিন্তু বিএসএফের এই আগ্রাসন আমাদের অসহায় করে তুলেছে। এখন এলাকায় উত্তেজনা চরমে, সবাই ভয়ে থাকছে।
বিজিবির ৬১ তিস্তা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শেখ মুহাম্মদ মুসাহিদ মাসুম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, “বিএসএফ সত্যিই দুইটি গরু নিয়ে গেছে। এটি সীমান্তের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অগ্রহণীয়। বিজিবির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে এবং গরুগুলো ফেরত আনার জন্য তৎপরতা চলছে। আমরা স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সজাগ রয়েছি।” লালমনিরহাটের স্থানীয় সাংবাদিকদের মতে, এই ঘটনা দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
এই ঘটনা সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদের সভাপতি এই ঘটনাকে ‘অন্যায় আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে বলেন, “আমরা সরকারের কাছে দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি। এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” স্থানীয়রা এখন বিজিবির উপর নির্ভর করে আছেন, যাতে এই ধরনের আরও হামলা ঠেকানো যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্তে বিএসএফের সঙ্গে জড়িত একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে ছায়া ফেলেছে। বিজিবির তৎপরতা সত্ত্বেও এই ঘটনা সীমান্ত রক্ষায় আরও শক্তিশালী ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, কূটনৈতিক পর্যায়ে এই সমস্যার সমাধান হবে এবং তাদের জীবিকা নিরাপদ থাকবে। এই ঘটনা শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, জাতীয় স্তরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com