ঢাকা ওয়াসায় আবারও পুরনো এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিতর্কিত তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান পদত্যাগ করেন। প্রায় দেড় দশক সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণে রাখার পর তার পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে এবার ওয়াসার ভেতরে তার ঘনিষ্ঠ মহল ও তথাকথিত “র্যামস গ্রুপ” আবারও প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
ওয়াসার অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, সংস্থাটিতে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের উন্নয়ন বাজেট পরিচালিত হয়, যার বড় একটি অংশ সবসময় একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে। বর্তমানে সেই গোষ্ঠী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের পছন্দের প্রার্থী হিসেবে সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীর নাম আলোচনায় এসেছে।
অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তারা জানান, দুজনই তাকসিম আমলে গঠিত সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তাকসিম এ খানের সময় যে কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর ভর করে তিনি সংস্থাটিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে এই দুইজন ছিলেন শীর্ষে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতেও নীতিগত অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে বয়সসীমা শিথিল রাখলেও কয়েকদিন পর সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে তা ৬০ বছরে নির্ধারণ করা হয়—যা অনেকের মতে নির্দিষ্ট প্রার্থীকে উপযুক্ত দেখানোর জন্য করা হয়।
অন্যদিকে, বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম ব্যাপারীর বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ গৃহীত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুদক ইতোমধ্যে ওয়াসা ভবন থেকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ করেছে। সালাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, পদোন্নতিতে অনিয়ম ও ঠিকাদারি কাজে পক্ষপাতের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনিক রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২১ সালে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়, যার কারণে তিনি দীর্ঘ সময় সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রশাসনিক তদবিরের মাধ্যমে তিনি পুনর্বহাল হন এবং ২০২4 সালের শুরুতে প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পান।
ওয়াসার কর্মকর্তারা জানান, তাকসিম এ খানের সময়কার “র্যামস গ্রুপ” নামের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ওয়াসার প্রায় সব বড় প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ঠিকাদার নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থেকেই পদ্মা পানি শোধনাগার ও দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগারসহ একাধিক প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ ও আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। বিভিন্ন অডিট প্রতিবেদনে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে সংস্থার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়।
সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মোস্তফা জানান, তাকসিম আমলে তিনি একাধিকবার দুর্নীতির বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করেছিলেন, কিন্তু কোনো তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগের পরপরই তাকে পদচ্যুত করা হয়।
ওয়াসা কর্মচারী ঐক্য পরিষদও একই সময়ে দুর্নীতির নানা তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের হিসাবে, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে পানি বিল, প্রকল্প ব্যয় ও রাজস্ব খাতে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে।
সংস্থার অভ্যন্তরীণ অনেক কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন—যদি পুরনো সিন্ডিকেটের প্রভাব আবার প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে ওয়াসার সেবা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা আবারও দুর্নীতির দুষ্টচক্রে পড়ে যাবে।
অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান ও আবদুস সালাম ব্যাপারীর মন্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com