[caption id="attachment_18587" align="aligncenter" width="300"]
বিআরটিএ’র ওয়েবসাইট ক্লোন করে ট্রাফিক জরিমানার নামে প্রতারণা[/caption]
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং তথ্য হাতিয়ে নিয়ে অর্থ আত্মসাৎকারী একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। চক্রটি এসএমএসের (SMS) মাধ্যমে ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে ফিশিং লিংকে প্রবেশ করিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে ব্যাংক কার্ড ও ওটিপি (OTP) তথ্য সংগ্রহ করত।
সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) জানায়, প্রযুক্তিগত তদন্ত, তথ্য বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে খুলনা, ফেনী ও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত অভিযান চালিয়ে চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন— মো. রাব্বি শেখ (২৪), মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) এবং মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)। তাদের বিরুদ্ধে অনলাইন প্রতারণা, ফিশিং এবং আর্থিক জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে কাজ করত ভুয়া জরিমানার ফাঁদ
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, প্রতারক চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে জানাত যে তাদের গাড়ি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং দ্রুত জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসএমএসে সংযুক্ত থাকত বিআরটিএ’র অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার এবং আইনি জটিলতার আশঙ্কায় অনেকেই লিংকটিতে প্রবেশ করে জরিমানা পরিশোধের চেষ্টা করতেন। সেখানে প্রবেশের পর ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যাংক কার্ড নম্বর, অ্যাকাউন্ট তথ্য ও অন্যান্য ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করা হতো। পরবর্তীতে বিভিন্ন কৌশলে ওটিপি নিয়ে তাদের ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হতো।
এক ভুক্তভোগীর ৩ লাখ টাকা গায়েব
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, এক ভুক্তভোগী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএ’র নামে ট্রাফিক জরিমানা সংক্রান্ত একটি এসএমএস পান। সেখানে উল্লেখ ছিল, তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, যা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে অর্ধেক অর্থাৎ ১ হাজার ৫০০ টাকা দিলেই চলবে।
বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি ওই লিংকে প্রবেশ করে একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে যান এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি প্রদান করেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, জরিমানা পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পরবর্তীতে তিনি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ দায়ের করেন। তদন্তে একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।
৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও মামলা
সিআইডির তদন্তে জানা গেছে, প্রতারক চক্রটি একই কৌশলে একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সর্বমোট ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী বাদী হয়ে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার।
দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান
মামলার তদন্তকালে প্রথমে খুলনার বটিয়াঘাটা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মো. রাব্বি শেখকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফেনী থেকে মো. রিয়াদ হোসেনকে এবং ঢাকার দক্ষিণখান এলাকা থেকে মো. সাজ্জাদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়।
সিআইডি জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিআইডির সতর্কবার্তা
সিআইডি জনগণকে এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে প্রেরিত কোনো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সঠিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও কোনো অবস্থাতেই অপরিচিত বা সন্দেহজনক ওয়েবসাইটে ব্যাংক কার্ড নম্বর, পিন, পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি শেয়ার না করার জন্য বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন প্রতারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ দমনে সিআইডির এই অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com