ঝিনাইদহ প্রতিনিধি:
চার বছরের অপেক্ষার পর আবারও ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় মেতেছে বিশ্ব। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর মতো বাংলাদেশের সমর্থকরাও ডুবে আছেন প্রিয় দলের সমর্থনে। তবে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে গেলে মনে হবে, বিশ্বকাপ যেন শুধু টেলিভিশনের পর্দায় নয়, নেমে এসেছে মানুষের ঘরে-আঙিনায়।
জাতীয় কবি গোলাম মোস্তফার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িকে কেন্দ্র করে পুরো গ্রাম সেজেছে ফুটবলের রঙে। পতাকার দোল, রঙিন দেয়ালচিত্র, প্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি এবং উৎসবমুখর মানুষের পদচারণায় গ্রামটি এখন যেন এক টুকরো বিশ্বকাপ ফ্যান জোন।
গ্রামে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক দৃশ্য। চারদিকে ফুটবলের আবহ। রাস্তার দুই পাশে উড়ছে বিভিন্ন দেশের পতাকা। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা, ব্রাজিলের হলুদ-সবুজসহ নানা দেশের পতাকায় রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
কবি গোলাম মোস্তফার বাড়ির মূল ফটক থেকে শুরু করে আঙিনা, কাচারিঘর, বসতঘর ও আশপাশের গাছপালাজুড়ে ফুটে উঠেছে বিশ্বকাপের আমেজ। দেয়াল, গাছ ও বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো হয়েছে লিওনেল মেসি, নেইমার জুনিয়র, কিলিয়ান এমবাপ্পেসহ বিশ্ব ফুটবলের জনপ্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি। কোথাও ফুটবল, কোথাও বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতীক, আবার কোথাও ফুটে উঠেছে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগঘন গল্প।
প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে ভিড় করছেন শত শত দর্শনার্থী। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভ) করছেন কিংবা ভিডিও ধারণ করে ছড়িয়ে দিচ্ছেন মনোহরপুরের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের গল্প।
শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। প্রিয় তারকাদের ছবি দেখে তারা আনন্দে আত্মহারা। কারও গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি, কেউ আবার ব্রাজিলের পতাকা কাঁধে জড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফুটবলপ্রেমের এই উৎসব যেন বয়সের সব সীমারেখা মুছে দিয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, এই আয়োজন এখন আর একটি বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পুরো গ্রামের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দলভেদে সমর্থন থাকলেও সবাই একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করছেন। সন্ধ্যা নামলেই চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাড়ির উঠোন—সবখানেই জমে উঠছে বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা।
স্থানীয় বাসিন্দা সিজার জিকরুল বলেন, “বিশ্বকাপ এলেই আমাদের গ্রামে আলাদা আনন্দ শুরু হয়। তবে এবার যে সাজসজ্জা করা হয়েছে, তা আগের সব আয়োজনকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ আসছে, গ্রামের পরিচিতিও বাড়ছে।”
দর্শনার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখে এসেছি। এখানে এসে মনে হচ্ছে কোনো বিদেশি ফ্যান জোনে চলে এসেছি। গ্রামের মধ্যে এমন আয়োজন সত্যিই অসাধারণ।”
স্থানীয় তরুণ শাওন শ্রাবণ বলেন, “আমরা চাই বিশ্বকাপের আনন্দ শুধু টেলিভিশনের পর্দায় সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। তাই সবাই মিলে এই আয়োজন করেছি। দর্শনার্থীদের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
আরেক দর্শনার্থী শিহাব হোসেন বলেন, “বিশ্বকাপের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার লক্ষ্য থেকেই এই আয়োজন। নিজেদের উদ্যোগে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ও আশপাশের এলাকা সাজিয়েছি। উদ্দেশ্য ছিল গ্রামে একটি উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করা এবং নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলার প্রতি উৎসাহিত করা।”
গ্রামবাসীরা বলছেন, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এই আয়োজনের স্মৃতি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে মানুষের মনে। কারণ এটি শুধু ফুটবল নয়, বরং মানুষের ভালোবাসা, ঐক্য এবং উৎসবপ্রিয়তারও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিশ্বকাপের উত্তাপ যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে মনোহরপুরে মানুষের আনাগোনা। ফুটবলের ভাষায় যেন পুরো গ্রাম আজ একটাই বার্তা দিচ্ছে—বিশ্বকাপ শুধু স্টেডিয়ামে নয়, মানুষের হৃদয়ের ভেতরেও খেলা করে।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com