পৃথক দপ্তর থেকে টাকা বরাদ্দ নিয়ে পুকুর খনন এবং সেই পুকুর ভরাট করার অভিনব এক নজির স্থাপন করেছেন কুষ্টিয়ার মিরপুর আমলা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ।
এর মাধ্যমে তিনি সরকারি প্রায় ৪০ লাখ টাকার অধিকাংশ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোদ সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং স্থানীয় এমপি বিষয়টিকে ‘অধ্যক্ষের পুকুর চুরি’র মাধ্যমে সরকারি টাকা ‘তছরুপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ক্ষোভ জানিয়েছেন অভিভাবকেরাও।
বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি নানা তালবাহানায় তা এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে এই প্রতিনিধির ফোনই আর রিসিভ করেন না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ কর্তৃপক্ষ জানায়, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের দপ্তরে পৃথকভাবে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করে। দুই দপ্তর হতে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রকল্পের অনুকুলে পৃথকভাবে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ এবং ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রাজু আহমেদ জানান, ‘সারাদেশে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্পাধীনে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা প্রাক্কলন ব্যয়ে আমলা সরকারি কলেজের পুকুর-০১ এবং পুকুর-০২ এর ঘাট নির্মাণসহ খনন কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ইতিমধ্যে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে সমুদয় বিলও পরিশোধ করা হয়েছে’।
এসব ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতিষ্ঠান প্রধান বা কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রক্রিয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেন। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হতে অর্থ বরাদ্দ পেলেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়।
তবে, অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী সংস্থা কলেজ কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে নামকাওয়াস্তে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, কলেজের মাঠটি খুবই ছোট হওয়ার কারণে পুকুর ভরাট করে মাঠ সম্প্রসারণের দাবি অনেক দিনের। অথচ এখন কলেজের অধ্যক্ষ যে পুকুর খনন করেছেন সেই পুকুরই আবার ভরাট করছেন।
এবিষয়ে মন্তব্য জানতে কলেজের অধ্যক্ষের দপ্তরে পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাতের সময়ে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। তার দপ্তর তালাবদ্ধ দেখা যায়।
পরে অধ্যক্ষ ড. নাজিম সুলতানের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে নানা তলবাহানায় প্রায় দশদিন ধরে সময় ক্ষেপণ করেন তিনি। এক পর্যায়ে ফোন রিসিভ থেকে বিরত থাকেন।
তবে, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যাদেশ পাওয়া ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী মাসুদুল হক জানান, ‘এটা কোনভাবেই কলেজের প্রিন্সিপ্যাল করতে পারেন না।
টাকা তো দুইটাই সরকারের, উনি যে কোন একটি টাকা খরচ করলেই কাজ হয়ে যেতো। বরং উনি পুকুর ভরাটের কাজ করলে শুধুমাত্র এলজিইডির টাকা দিয়েই সম্পন্ন করতে পারতেন।
তা না করে উনি আবার এই চলতি অর্থ বছরেই শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের টাকা বরাদ্দ নিয়ে ভরাটের কাজে ব্যয় করছেন। এটা নিছক অন্যায় বা দুর্নীতি-যেটাই বলি তাই করেছেন অধ্যক্ষ’।
এ বিষয়ে কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সিহাব উদ্দিন বলেন, ‘এটা কোন কথা হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জায়গায় এমন প্রকাশ্য নিয়মবহির্ভুত কাজ করে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় কোনভাবেই কাঙ্খিত নয়। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করছি’।
এদিকে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল আহসান জানান, ‘এ বিষয়টি তো আমাদের কাছে গোপন করেছেন আমলা কলেজ কর্তৃপক্ষ।
ইতিমধ্যে চলতি অর্থ বছরে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের বরাদ্দ নিয়ে যে পুকুর খননসহ নতুন করে ঘাট নির্মাণ করেছেন, সে দুটি পুকুরের মধ্যে একটি পুকুর শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ভরাট করা হচ্ছে।
এখানে অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় কলেজ কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারেন না’।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর বলেন, ‘আমলা সরকারি কলেজে একই অর্থ বছরে পৃথক দুটি সরকারি দপ্তর থেকে টাকা বরাদ্দ নিয়ে একই পুকুর খনন করা হলো, আবার সেই খনন করা পুকুরই ভরাট করা হচ্ছে, এটাতো স্পষ্টত বিধিবহির্ভুতভাবে সরকারি টাকা তছরুপের সামিল।
বিষয়টি সম্পর্কে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে পূর্ব হতে কিছুই জানায়নি। এভাবে নিয়ম বহির্ভুতভাবে সরকারি টাকা তছরুপ হয়ে থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে’।
বিষয়টি খোজ নাও
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com