সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ধর্মীয় ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’। কিন্তু নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে এ কার্যক্রমের অনেক কেন্দ্রেই নিয়মিত পাঠদান না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও নির্ধারিত সময়ে কেন্দ্রের দরজায় তালা, কোথাও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর দেখা নেই। আবার খাতায় শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে শ্রেণিকক্ষ ফাঁকা পড়ে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
গত ২ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা থেকে ৮টা পর্যন্ত মোহনগঞ্জ উপজেলার একাধিক সহজ কোরআন শিক্ষা ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রে সরেজমিন গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রের সাইনবোর্ডে পাঠদানের সময় উল্লেখ থাকলেও নির্ধারিত সময়ে সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরিদর্শনের খবর পেলে কিছু কেন্দ্রের শিক্ষক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থী এনে সাময়িকভাবে উপস্থিতি দেখান। পরিদর্শন শেষ হলে আবারও ফাঁকা হয়ে যায় কেন্দ্র। এতে সরকারের অর্থ ব্যয় হলেও প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৯৪ কেন্দ্রে কার্যক্রম
ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, মোহনগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র ৬০টি এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র ৩৪টিসহ মোট ৯৪টি কেন্দ্র রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র সকাল ৬টা থেকে ৮টা এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পরিচালিত হওয়ার কথা।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিকাংশ কেন্দ্রেই নিয়মিত পাঠদান হয় না। কোনো কোনো কেন্দ্রে শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের উপস্থিতি খুবই কম। আবার কিছু কেন্দ্রে শিক্ষকই নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি কেন্দ্রের সাইনবোর্ডে নির্ধারিত সময় উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনো কার্যক্রম চলছিল না। এতে প্রশ্ন উঠেছে—নির্ধারিত সময়ের পাঠদান যদি না হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পাঠদানের হিসাব কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে?
সপ্তাহে একদিন যাওয়ার অভিযোগ
শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, কোনো কোনো শিক্ষকের বাসস্থান এক ইউনিয়নে হলেও তাঁর দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্র অন্য ইউনিয়নে। ফলে তাঁরা নিয়মিত কেন্দ্রে না গিয়ে সপ্তাহে একদিন, বিশেষ করে শুক্রবার, কেন্দ্রে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষকও মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতির অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দায়সারা পরিদর্শন করায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জাল সনদ ও স্বজন দিয়ে পাঠদানের অভিযোগ
কয়েকজন শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, একাধিক শিক্ষক জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করছেন। কোথাও কোথাও দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকের পরিবর্তে তাঁর স্বজন দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া নিকাহ রেজিস্ট্রারসহ বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্বীকার করলেন ফিল্ড সুপারভাইজার
মোহনগঞ্জ উপজেলা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. হাফিজুর বলেন, ‘অনেক কেন্দ্রে আশানুরূপ শিক্ষার্থী নেই। কোনো কোনো কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষার্থীও পাওয়া যায় না।’ এর কারণ হিসেবে এলাকায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আধিক্যের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষকদের অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কেন্দ্র বন্ধ বা খোলার ক্ষমতা আমার নেই। আমাদের কাছে অভিযোগ আছে, অনেক শিক্ষক সময়মতো পাঠদান করেন না। তাঁরা এক এলাকায় বসবাস করেন, কিন্তু দায়িত্ব পালন করেন অন্য এলাকায়।’
তিনি জানান, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের নিয়ম অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থী একই সময়ে অন্য কোনো সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে এখানে পড়তে পারবে না। তবে সহজ কোরআন শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে কোরআন শিক্ষা নিতে পারে।
মাসে ৬ হাজার ৩০০ টাকা সম্মানী
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এসব কেন্দ্রের শিক্ষকরা প্রতি মাসে ৬ হাজার ৩০০ টাকা সম্মানী ভাতা এবং দুই ঈদে বোনাসসহ বিভিন্ন সুবিধা পান। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত পাঠদান না করেও অনেকে মাস শেষে এসব সুবিধা গ্রহণ করছেন।
নিয়ম অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্রে ৩০ জন এবং সহজ কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রে ৩৫ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কেন্দ্রেই শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কাঙ্ক্ষিত নয়। কোথাও কোথাও কেন্দ্র শিক্ষক-শিক্ষার্থীশূন্য থাকার অভিযোগও রয়েছে।
তদন্তের দাবি
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ধর্মীয় ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া এই কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তদারকির ঘাটতি ও অনিয়মের কারণে এর সুফল থেকে শিশুরা বঞ্চিত হলে পুরো উদ্যোগই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাঁদের দাবি, মোহনগঞ্জ উপজেলার সব কটি কেন্দ্রের কার্যক্রম সরেজমিন তদন্ত করা, শিক্ষকদের উপস্থিতি ও শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা, শিক্ষাগত সনদ পরীক্ষা করা এবং নিয়মিত পাঠদান না করে সরকারি সম্মানী নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com