বাংলা চলচ্চিত্রে 'ভিলেন রাজীব' নামটি একসময় রীতিমতো কিংবদন্তি ছিল। তাঁর অভিনয় দক্ষতা, ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা তাঁকে সিনেমার পর্দার বাইরে একজন অসাধারণ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। কিন্তু এই সফলতার পেছনে এক গোপন বিষাদ লুকিয়ে ছিল, যা অনেকেই জানেন না। সেটি হলো তাঁর প্রিয় দুই ছেলের, জয় ও বিজয়ের, করুণ মৃত্যুর ঘটনা।
১৯৮৬ সালে রাজীব ভাইয়ের দ্বিতীয় স্ত্রী দেবী গাফ্ফারের গর্ভে জন্ম নেয় যমজ দুই পুত্রসন্তান- জয় ও বিজয়। তারা ছিল রাজীব ভাইয়ের চোখের মণি। শুটিং, প্রযোজনা, পরিচালনা- সব ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ছেলেদের জন্য সময় বের করতেন। তাদের নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার।
কিন্তু সেই স্বপ্ন একদিন ধুলিসাৎ হয়ে যায় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে।
সেই দিনটি ছিল ১২ জুলাই, ১৯৯৫। মাত্র ৯ বছর বয়সে দুই ভাই তাদের মায়ের সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল নানার বাড়ি। বাড়িটির পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটি নদী ছিল, যা তাদের খুব আকর্ষণ করেছিল। কিন্তু কেউ জানত না, এই নিষ্পাপ দুটি শিশু নিজেদের জীবনের শেষ মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জয় ও বিজয় কাউকে কিছু না জানিয়ে নদীতে গোসল করতে নামে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তারা কেউই সাঁতার জানত না। কেউ বুঝে ওঠার আগেই নদীর গভীরে তলিয়ে যায় দুই শিশু। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে নদীর তলদেশ থেকে তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
সেই মুহূর্তের যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
ঘটনার দিন নারায়ণগঞ্জ জেলার পাগলার পপুলার স্টুডিওতে শ্যুটিং চলছিল ‘ফ্রেন্ডস মুভিজ’ এর ব্যানারে নির্মিত “চালবাজ” ছবির। ছবির পরিচালক ছিলেন শওকত জামিল ভাই। অভিনেতা ওমর সানী, নায়িকা শাহনাজ এবং ডলি জহুর তখন ক্যামেরার সামনে দৃশ্য ধারণে ব্যস্ত।
আমি নিজে, রবিউল ইসলাম রাজ, সেই ছবির সহকারী পরিচালক ছিলাম। শ্যুটিং ইউনিটে ছিলেন সচিন কুমার নাগ এবং এস. আর. রেজা, প্রধান সহকারী পরিচালক হিসেবে। সবার মতো আমরাও জানতাম না, কী এক অভিশপ্ত সংবাদ অপেক্ষা করছে সামনে।
শ্যুটিং সেটে রাজীব ভাই এবং মিজু আহমেদ ভাই পাশে বসেছিলেন, মনোযোগ দিয়ে দৃশ্য দেখছিলেন। হঠাৎ রাজীব ভাইয়ের ওয়্যারলেসে একটি ফোন আসে। তিনি ফোনটি রিসিভ করার সঙ্গে সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর সেই কান্না শ্যুটিং ইউনিটের সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়। মিজু ভাই তাঁকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তারপর তিনি শওকত জামিল ভাইকে শ্যুটিং প্যাকআপ করার নির্দেশ দেন। আমাদের সবাইকে বললেন- রাজীব ভাইয়ের দুই ছেলে পানিতে ডুবে মারা গেছে।
আমি সেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না। এত প্রাণবন্ত দুটি শিশু—আজ নেই! রাজীব ভাই ও মিজু ভাই দ্রুত গাড়িতে উঠে রওনা দেন বাড়ির দিকে। আমরা বাকিরা শোকাহত হয়ে বসে থাকি।
এই ঘটনার পর থেকে রাজীব ভাই আর কখনো আগের মতো ছিলেন না। তাঁর মুখের হাসি, মনের প্রাণচাঞ্চল্য, সব কিছুতেই একটা শূন্যতা চলে আসে। তিনি কাজ করতেন ঠিকই, কিন্তু চোখেমুখে সবসময় একটা বিষাদের ছাপ থাকত। বাবা হিসেবে সন্তান হারানোর কষ্ট যে কত গভীর হতে পারে, তা রাজীব ভাইয়ের চেহারায় প্রতিনিয়ত প্রতিফলিত হতো।
মিজু আহমেদ ভাইও এই ঘটনার পর রাজীব ভাইয়ের পাশে ছিলেন প্রতিটি মুহূর্তে। আজ, দুঃখজনকভাবে তাঁরাও আমাদের মাঝে আর নেই। রাজীব ভাই চলে যান ২০০৪ সালে, আর মিজু ভাইও কিছু বছর পরে বিদায় নেন।
আজ ১২ জুলাই নয়, তবু এই মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে পড়ল খুব। জয় ও বিজয় যদি বেঁচে থাকত, আজ হয়তো তারা বাবা-মায়ের গর্ব হয়ে উঠত, হয়তো চলচ্চিত্রেই নাম করত কিংবা অন্য কোনো পথ বেছে নিত জীবনে। কিন্তু নিয়তির নির্মম ছোবলে তারা হারিয়ে গেছে মাত্র ৯ বছর বয়সে।
তাদের স্মরণে এই লেখাটি শুধু একটুকরো ইতিহাস নয়, একটুকরো ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং অপূর্ণ স্বপ্নের স্মারক।
আমার প্রাণ থেকে দোয়া, আল্লাহ যেন রাজীব ভাই, মিজু ভাই এবং দুই শিশু জয় ও বিজয়কে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে স্থান দেন। আমিন।
রবিউল ইসলাম রাজ
চলচ্চিত্র পরিচালক
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com