ফুল-ফলবিহীন গাছ লাগিয়ে পাখিদের সত্যানাশ? পরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদ না অবিবেচনায় প্রকৃতি হচ্ছে সাজানো? যেমনটি কোন মানুষকে পানি ছাড়া মরুভূমিতে বেঁচে থাকার করতে হয় যুদ্ধ! নাকি মানুষ নিভৃতে অজান্তেই এমন ভুল করে ফেলছে? নাকি করছে ইচ্ছে করেই?
শহরের বাগান বা বহুতল কমিউনিটির খালি জায়গায় যখন মানুষ গাছ লাগান, সাধারণত উদ্দেশ্য থাকে — ছায়া, সৌন্দর্য বা ফল পাওয়া। কিন্তু কোথাও কোথাও দেখা যায়, বসতবাড়ি বা পার্কে ফল-হীন, বা স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো না এমন গাছ লাগানো হচ্ছে — ফলে পাখি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য সেটি হয়ে উঠছে "এক ধরনের পরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদ"। অপরদিকে যেসব এলাকায় প্রকৃতই মরুভূমির মতো পানির সংকট রয়েছে, সেখানে পানি-ছাড়া গাছ লাগানো হয় — সেটিও বেঁচে থাকার জন্য নেষ্ঠ প্রচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
নাম করে কেউ উদ্দেশ্যপূরণ করছেন কি, নাকি অজানের ভুলে পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে — দু’ই ভাবনার উপযুক্ত। তবে ফলাফল একই: পাখি, মৌমাছি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় সংকটে পড়ছে, আর রোপিত গাছগুলোর বেশিরভাগই অস্থায়ী সাইনো।
গাছ লাগানোর মানেই নেই যদি না হয়পরিবেশ সুরক্ষা:
বহু শহরবাসী ও আবাসিক সংগঠন বাগান-ল্যান্ডস্কেপিংয়ে বিদেশি প্রজাতির বনজ গাছ লাগিয়ে থাকেন — দেখতেও আকর্ষণীয়, কিন্তু সেই গাছগুলোর ফল নেই বা স্থানীয় পাখির জন্য খাদ্য নয়। ফলে পাখিরা ওই গাছে এসে বাসা বাঁধলেও খাদ্য না পেয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। অতিমাত্রায় পাখি একে অপরের থেকে দূরে সরে গেলে প্রজনন ব্যাহত হয়।
আর একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখা যায় চট্টগ্রাম-চরাঞ্চল কিংবা উত্তরাঞ্চলের কিছু খয়েরি এলাকায়, যেখানে শুষ্ক আবহাওয়া ও পানির অভাবে অপ্রাসঙ্গিক গাছ রোপণ করা হয় — এমন গাছগুলোকে পুষ্টি যোগানো না থাকায় দ্রুত দগদগে হয়ে যায়, গাছের মূলে জমে থাকা শুকনো পাখারা বা কুঁড়েমি প্রাণীরা টিকে থাকতে পারে না। বাস্তবে এমন গাছ লাগানো মানে হলো — পাখিদের জন্য পরিকল্পিত মৃত্যু ফাঁদ।
কেন এমন হচ্ছে? culpable ignorance না নন্দিততা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ আছে—
অবচেতন ডিজাইন ও বিনির্মাণ: উদ্যান পরিকল্পনায় কিংবা আবাসিক প্রকল্পে ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে গাছ বাছাই না করা; সৌন্দর্যবোধক কারণে বিদেশি গাছ বসানো।
বোঝাপড়া-অভাব: গাছের প্রজাতি ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের সম্পর্ক বোঝার অভাব।
* পানি-সাশ্রয়ী নীতির অভাব: শুষ্ক এলাকায় জল-সংরক্ষণ না করে গাছ লাগিয়ে ফেলা।
* অর্থনৈতিক কথা: কম রক্ষণাবেক্ষণে থাকা গাছ বা দ্রুত বড় হয় এমন প্রজাতিই বেছে নেওয়া হয়, ফলনভিত্তিক নয়।
কেন্দ্রীয় উদ্যাননীতি বিশ্লেষকরা বলেন, “গাছ লাগানো মানেই পরিবেশ বাঁচানো—এই ভুল ধারনা বদলাতে হবে। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রকে বুঝেই গাছ নির্বাচন, জল-সহায়তা ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক।”
বাস্তব উদাহরণ: শহরের নতুন আবাসিক প্রকল্পে সমস্যা
একটি আবাসিক কমিউনিটির উদ্যান রক্ষণাবেক্ষণে দেখা গেছে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এক বিদেশি প্রজাতির বড় গাছ লাগানো হয়েছিল — দেখতে এনেছে হরেক রকম ছায়া, কিন্তু এতে নয় পাতার ভেতর ফল নেই, নয় পাখির পুষ্টির উৎস। ফলে এলাকাটি মৌমাছি ও পাখির সংখ্যা কমে গেছে; আশপাশের ছোটাছুটি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, “গাছ আছে, কিন্তু গাছের খেয়াল নেই — পাখি চলে গেছে”।
আরেক দৃষ্টান্ত: উত্তরাঞ্চলের খাস জমিতে বালিয়াপোকার (desertification) প্রতিরোধে যে গাছ গড়া হয়েছিল, সেগুলো প্রাথমিক ব্যর্থ হয়েছে কারণ সঠিক পানি-সংরক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না—ফলশ্রুতিতে মাটি আরো শুষ্কতা গ্রহণ করেছে এবং স্থানীয় গৃহস্থালি জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
সমাধান ও সুপারিশ
এই সমস্যার মূলে না গিয়ে অচিরেই কিছু কার্যকরী উদ্যোগ নেয়া গেলে বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব:
1. স্থানীয় প্রজাতি অগ্রাধিকার:গাছ লাগানোর আগে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের পরামর্শ নিয়ে স্থানীয় ফলদ ও ফুলফলকারি গাছ বাছাই করা।
2. জলসংরক্ষণ প্রযুক্তি: রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং, ড্রিপ-ইরিগেশন ও মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করে গাছের টিকে থাকার সম্ভাব্যতা বাড়ানো।
3. কৌশলগত প্ল্যানিং: কোন এলাকায় কোন প্রজাতি লাগানো হবে—এটি শহর পরিকল্পনাকারী ও বাড়ি মালিকদের নিয়মে থাকা উচিত।
4. কমিউনিটি শিক্ষা ও অংশগ্রহণ: স্থানীয় স্কুল-কলেজ, এনজিও, বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি; গাছের পরিচর্যা ও পাখি-বন্ধু নীতির প্রচার।
5. রক্ষণাবেক্ষণ বাজেট: গাছ লাগানোর পাশাপাশি সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তহবিল ও তদারকি বাধ্যতামূলক।
গাছ লাগানো মানেই পরিবেশ রক্ষা—এই ধারণা অবশ্যই ভালো। কিন্তু যদি সেই গাছগুলো স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও জীবনধারার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো না থাকে, তা হলে তা হতে পারে পাখি ও ক্ষুদ্রপ্রাণীর জন্য বাঁচার যুদ্ধকে আরও কঠিন করা। পরিকল্পনা ও জ্ঞান ছাড়া করা গাছ রোপণ অনিচ্ছাকৃতভাবে এক ধরণের মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে। তাই এখনই সময়—সঠিক প্রজাতি বাছাই, পানি-নীতি ও জনসচেতনতা বাড়িয়ে গাছকে প্রকৃত অর্থেই জীবনদাত্রী করা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com