বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। স্থানীয় সময় সোমবার রাতে নিউইয়র্কের একটি হোটেলে তিনি নিহত দিদারুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের হাতে সম্মানসূচক ক্রেস্ট তুলে দেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন- পত্রিকায় খবরটি পড়ে আমি মর্মাহত হয়েছিলাম। কীভাবে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে তা ভেবে আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তীতে টেলিভিশনে যখন তাঁর শেষ বিদায়ের দৃশ্য দেখলাম, তখন দেখলাম হাজারো মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শোক জানাতে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে দিদারুল কতটা সম্মানিত এবং প্রিয় ছিলেন মানুষের কাছে। নিউইয়র্ক সফরের পরিকল্পনার মধ্যে আমরা মনে করেছি অবশ্যই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন দিদারুল ইসলামের বাবা মোহাম্মদ আবদুর রব, মা মিনারা বেগম, স্ত্রী, দুই ছেলে আয়হান ইসলাম ও আজহান ইসলাম, ভাই কামরুল হাসান, ভাইয়ের ছেলে আদিয়ান হাসান, বোন নাদিমা বেগম এবং চাচা আহমেদ জামাল উদ্দিন। প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন ও যুগ্ম আহ্বায়ক ডা. তাসনিম জারা।
পরিবারের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, দিদারুল ইসলাম নিউইয়র্ক পুলিশের একজন দায়িত্বশীল, সাহসী এবং প্রশংসিত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০২১ সালে এনওয়াইপিডিতে যোগদান করেন এবং ব্রঙ্কসের ৪৭ নম্বর প্রিসিঙ্কটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সহকর্মী এবং স্থানীয় কমিউনিটির কাছে একজন নির্ভরযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। পরিবার জানান, দিদারুল শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তা নন, বরং তিনি ছিলেন একজন ভালো বাবা, দায়িত্বশীল সন্তান এবং সহৃদয় মানুষ। তাঁর দুই সন্তানের বয়স এখনো খুব কম। তারা বাবার শূন্যতা অনুভব করে প্রতিদিন কষ্ট পাচ্ছে।
গত ২৮ জুলাই নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের পার্ক অ্যাভিনিউয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় এক তরুণ বন্দুকধারী। তিনি বহুতল করপোরেট ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে নির্বিচারে গুলি ছোড়েন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে যান পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলাম। হামলাকারীকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তিনি একাধিক গুলিতে গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। পরে জানা যায়, দিদারুলের শরীরে আট থেকে দশটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। হামলার পরপরই ওই বন্দুকধারী নিজেকেও গুলি করে আত্মহত্যা করেন।
নিউইয়র্কে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ স্থানীয় মার্কিন নাগরিকরাও শোকাহত হন। তাঁর শেষকৃত্যে হাজারো মানুষ অংশ নেন, যা নিউইয়র্কে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি বিরল ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন স্থানীয়রা।
প্রধান উপদেষ্টা দিদারুলের পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন- তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। দিদারুল শুধু বাংলাদেশের গর্ব নন, তিনি নিউইয়র্কের মানুষদের কাছেও এক নায়ক হয়ে আছেন। তাঁর আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্থান করে নেবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সরকার সবসময় প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশে রয়েছে এবং দিদারুল ইসলামের পরিবারের জন্য যেকোনো সহযোগিতা করার ব্যাপারে তারা আন্তরিক।
দিদারুল ইসলামের পরিবার জানিয়েছেন, তাঁকে হারিয়ে তারা শোকে মুহ্যমান হলেও তাঁর কর্মজীবনের সাহসী অবদান ও আত্মত্যাগ তাঁদের গর্বিত করেছে। পরিবারের সদস্যরা বলেন, “তিনি ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ পুলিশ কর্মকর্তা। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমরা চাই তাঁর এই আত্মত্যাগের কথা সবাই মনে রাখুক।”
বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতারা জানিয়েছেন, দিদারুলের মৃত্যু শুধু পরিবারের জন্য নয়, পুরো প্রবাসী সমাজের জন্যও এক বিরাট ক্ষতি। তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস। তাঁর কাজ, সততা ও সাহস অনেককে পুলিশের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় আগ্রহী করে তুলেছিল।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন পুলিশ কর্মকর্তা দিদারুল ইসলামের মৃত্যু একদিকে যেমন তাঁর পরিবারের জন্য বেদনাদায়ক, অন্যদিকে বাংলাদেশ ও প্রবাসী সমাজের জন্য গৌরবেরও প্রতীক। তাঁর আত্মত্যাগ স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রধান উপদেষ্টার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও সমবেদনা প্রকাশ শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি দিদারুলের প্রতি বাংলাদেশের সম্মান প্রদর্শনের প্রতিফলন।
এই মহান পুলিশ কর্মকর্তার স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দায়িত্বশীলতা, সাহস এবং মানবিকতার শিক্ষা দিয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশাই করেছেন উপস্থিত সবাই।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com