বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও প্যারিসের মেয়র অ্যান হিডালগোর মধ্যে মঙ্গলবার নিউইয়র্কে এক সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিউইয়র্ক সফররত মেয়র হিডালগো তার হোটেল কক্ষে প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান। দুই নেতার মধ্যে আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আসন্ন নির্বাচন, বৈশ্বিক শরণার্থী সংকট, সামাজিক ব্যবসার প্রসার এবং খেলাধুলার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের নানা দিক।
অধ্যাপক ইউনূস আলোচনার শুরুতেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকৌশল সম্পর্কে মেয়র হিডালগোকে অবহিত করেন। তিনি জানান, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনকে দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন- আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে একটি ভিত্তি, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলবে।
মেয়র হিডালগো বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক সংস্কারকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন- আমি আপনার নেতৃত্বের প্রশংসা করি। আপনি চমৎকার কাজ করেছেন। বাংলাদেশের জনগণের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।
প্রধান উপদেষ্টা ব্যাখ্যা করেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কেবল নির্বাচনের প্রস্তুতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়তে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক সম্প্রীতি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় সামাজিক ব্যবসার প্রসঙ্গ। প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিককে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সামাজিক ব্যবসা ইভেন্টে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে অধ্যাপক ইউনূসের অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি মেয়র হিডালগোর সাথে আলাপচারিতায় আসন্ন লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক ও ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসরগুলোকে কার্বন নিরপেক্ষ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তার মতে, খেলাধুলার মতো বৈশ্বিক অনুষ্ঠানগুলো কেবল প্রতিযোগিতা নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
মেয়র হিডালগো একমত পোষণ করে জানান, প্যারিস সিটি কাউন্সিলও টেকসই উন্নয়ন ও সবুজ উদ্যোগ বাস্তবায়নে কাজ করছে। তিনি বলেন, বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলো সামাজিক ব্যবসা ও মানবিক কার্যক্রমে অনুপ্রেরণা দিতে পারে।
আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যু। বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের শিবিরগুলোতে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। উভয় নেতা এই সংকটকে বিশ্বের অন্যতম গুরুতর মানবিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, জাতিসংঘ আগামী সপ্তাহে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করছে। এ সম্মেলনের লক্ষ্য বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আবারও এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকে আকর্ষণ করা এবং নতুনভাবে তহবিল সংগ্রহ করা। তিনি উল্লেখ করেন- রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি। দীর্ঘ সময় ধরে সংকটে আটকে থাকা এই জনগোষ্ঠীকে টেকসই সমাধান ছাড়া সাহায্য করা সম্ভব নয়।
মেয়র হিডালগো এ বিষয়ে তার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বিশ্বজুড়ে শরণার্থী শিবিরগুলোতে মানবিক অবস্থা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে, তার নিশ্চয়তা দিতে হবে।” তিনি রোহিঙ্গা সহায়তায় আন্তর্জাতিক তহবিল বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে মেয়র হিডালগো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন- আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করবে এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রধান উপদেষ্টা পাল্টা বক্তব্যে জানান, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সহযোগী ও বন্ধুদের ভূমিকা দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও মজবুত করবে। তিনি মেয়র হিডালগোকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সমন্বয়কারী ও বাংলাদেশ সরকারের সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ। তিনি আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সামাজিক ব্যবসা ভিত্তিক উদ্যোগ সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য তুলে ধরেন।
নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত এ বৈঠককে উভয় নেতা কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সাক্ষাৎ নয়, বরং ভবিষ্যতের যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেছেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে মানবিক উন্নয়নের প্রচেষ্টা- সব মিলিয়ে এ সাক্ষাৎকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com