সাম্প্রতিক এক জরিপে বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, যেখানে দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি ও পারস্পরিক অসম্মানকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার গবেষক এসএম শহিদুল ইসলাম বাবলু'র পরিচালিত এই জরিপটি গত ৯ মাসে ২৪৫ জন তালাকপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের উপর ভিত্তি করে তৈরি। জরিপের ফলাফল শুধু বিচ্ছেদের কারণই নয়, বরং এর পরবর্তী অনুশোচনা ও সামাজিক প্রভাবের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছে।
জরিপ অনুযায়ী, দাম্পত্য জীবনের ভুল বোঝাবুঝি এবং একে অপরকে যথাযথ সম্মান না দেওয়ার কারণে ৭২% তালাক সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও, ১৮% তালাকের পেছনে পরকীয়া সম্পর্ক এবং ১০% ক্ষেত্রে স্ত্রীর বিলাসী জীবনযাপন দায়ী। অংশগ্রহণকারীদের মতামত থেকে জানা যায়, ৭৮% ক্ষেত্রে নারীদের এবং ২২% ক্ষেত্রে পুরুষের কারণে তালাক ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বিবাহবিচ্ছেদে নারীর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, এর পেছনের কারণগুলো সমাজের গভীর অসঙ্গতিকে নির্দেশ করে।
সবচেয়ে মর্মস্পর্শী তথ্য হলো, তালাকের পর ৯২% নারী-পুরুষই তাদের সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হয়েছেন। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই অনুশোচনার মাত্রা অনেক বেশি। জরিপে দেখা গেছে, ৮৯% তালাকপ্রাপ্ত নারী পুনরায় বিয়ে করতে পারেননি। মাত্র ৪% নারী পুনরায় বিয়ের প্রতি আগ্রহ দেখাননি এবং ৭% নারী ভুল পথে চলে গেছেন। অন্যদিকে, ৮৫% পুরুষ পুনরায় বিয়ে করে সংসার করছেন। এই অসমতা সমাজে নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদের পরের জীবন কতটা কঠিন করে তোলে, তা স্পষ্ট করে।
দ্বিতীয় বিবাহ সংক্রান্ত তথ্যেও একই বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়। ১২% নারী দ্বিতীয় বিয়ের পরেও তালাকের শিকার হয়েছেন এবং ৮৯% নারী তাদের দ্বিতীয় সংসারে অসুখী। বিপরীতে, পুরুষদের ক্ষেত্রে মাত্র ২% পুরুষ দ্বিতীয়বার তালাক দিয়েছেন এবং ৩% অসুখী সংসারে রয়েছেন। বিস্ময়করভাবে, যেসব পুরুষ দ্বিতীয়বার তালাকের শিকার হয়েছেন, তাদের স্ত্রীরা প্রায় সবাই পূর্বে তালাকপ্রাপ্ত নারী ছিলেন। এর বিপরীতে, যেসব পুরুষ বিধবা নারীকে বিয়ে করেছেন, তাদের ৯৩% সুখী দাম্পত্য জীবন কাটাচ্ছেন।
গবেষক এসএম শহিদুল ইসলাম বাবলু বিবাহবিচ্ছেদের বিরুদ্ধে কাজ করার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, "পরিবার ভেঙে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও সন্তানরা।" এই জরিপটি শুধু কিছু পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্মান ও সহমর্মিতার গুরুত্ব কতটা অপরিহার্য। বিবাহবিচ্ছেদ শুধু একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সমস্যা মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা অপরিহার্য।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com