বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি “বৈধ”, কিন্তু সমাজের চোখে এখনো “অপবিত্র”।
রাষ্ট্র আইনত এই পেশাকে স্বীকৃতি দিলেও, সুরক্ষা দেয়নি; সুযোগ দিয়েছে টিকে থাকার, কিন্তু পথ দেখায়নি পুনর্বাসনের।
ফলে বহু নারী “স্বেচ্ছায়” পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়েও পরে নানা অপকর্ম, অপরাধচক্র বা মাদকনির্ভর দুনিয়ায় গা ভাসায়।
পতিতাবৃত্তি থেকে রেমিট্যান্স: রাষ্ট্র কি ভাবতে পারে এমন এক বাস্তব বিকল্প পথ নিয়ে?
তাহলে প্রশ্ন আসে—
রাষ্ট্র কেন এই বিশাল মানবসম্পদকে একটি নতুন, নিরাপদ ও উৎপাদনশীল পথে ব্যবহার করার চিন্তা করে না?
বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় দ্বিধা:
বাংলাদেশে নারী কর্মসংস্থান সীমিত, বিশেষ করে নিম্নশিক্ষিত বা সমাজচ্যুত নারীদের ক্ষেত্রে।
এই শ্রেণির নারীরা যখন সমাজে আর কোনো সুযোগ খুঁজে পায় না, তখন পতিতাবৃত্তিই হয়ে ওঠে টিকে থাকার শেষ উপায়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্র প্রতিবছর প্রবাসে পাঠায় লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিক—
কারও কাজ গৃহকর্মী, কারও সেবিকা, কারও শিল্পে শ্রমিক।
তারা দেশে পাঠায় হাজার হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স।
তাহলে প্রশ্ন—
যে নারীরা পতিতাবৃত্তিতে আছে, তাদের জন্য কেন পুনর্বাসন বা আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণভিত্তিক কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয় না?
অর্থনীতির বাস্তব ভাষা:
বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পায় (বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী)।
এই টাকার প্রায় ৭৫% আসে নারী শ্রমিকদের ঘামঝরা পরিশ্রম থেকে।
কিন্তু দেশে যারা পতিতাবৃত্তিতে জড়িত, তাদের সংখ্যা আনুমানিক লক্ষাধিক— যাদের অধিকাংশই তরুণ, কর্মক্ষম, কিন্তু “অস্বীকৃত” নাগরিক।
রাষ্ট্র যদি এই নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপত্তা, ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে বিদেশে 'কেয়ার গিভার', 'হসপিটাল এইড', বা 'এন্টারটেইনমেন্ট ও সার্ভিস সেক্টর কর্মী' হিসেবে পুনর্গঠন করে পাঠাতো,
তবে এটি শুধু মানবিক পুনর্বাসন নয়— অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণও হতে পারত।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দেয়াল:
তবে সবচেয়ে বড় বাধা হলো সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি।
আমরা “পতিতা” শব্দটি শুনে নৈতিক বিচার শুরু করি,
কিন্তু “অর্থনৈতিক কাঠামো” বা “রাষ্ট্রের দায়িত্ব” নিয়ে ভাবি না।
যদি পতিতাবৃত্তি একটি আইনত স্বীকৃত পেশা,
তাহলে রাষ্ট্রেরও উচিত — তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়া।
কাজের সুযোগ তৈরি না করে শুধু তিরস্কার করলে,
অপরাধ ও মানবপাচারই বাড়বে — রাষ্ট্রের আয় নয়।
রাষ্ট্র যদি চায় সত্যিকারের মানবিকতা,
তাহলে তাকে নৈতিক মুখোশ খুলে বাস্তব সমাধান ভাবতে হবে।
যে নারী পতিতাবৃত্তি করে টিকে আছে,
সে নষ্ট নয় — সে বঞ্চনার শিকার।
তাকে সুযোগ দিলে সে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবে,
কিন্তু সুযোগ না দিলে সে হারিয়ে যাবে অপরাধ আর দারিদ্র্যের চক্রে।
“রাষ্ট্র যদি পতিতাবৃত্তিকে বৈধই বলে মানে,
তবে সেই নারীদের বৈধ কর্মসংস্থানের পথ না দেখানোই আসল অন্যায়।”
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com