দল বদল বা রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তন — বিষয়টি আজ আর কেবল ক্ষমতার অংকের খেলা নয়, বরং গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তিকে নাড়া দেয়ার মতো এক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশেও দেখা যায়, নির্বাচনের পর পরাজিত দল থেকে বিজয়ী দলে যোগ দেওয়া যেন এক ধরনের "রাজনৈতিক অভ্যাস" হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— গণতন্ত্র কি এটাকেই চায়?
গণতন্ত্রে স্বাধীনতার সীমানা কোথায়?
গণতন্ত্র ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রতীক। একজন রাজনীতিক তার মতাদর্শ, চিন্তা ও অবস্থান বদলাতে পারেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি জনগণের আস্থাকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তবে তা আর স্বাধীনতা নয়— "বিশ্বাসঘাতকতা"।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন—
“যে স্বাধীনতা দায়িত্ববোধ ছাড়া চাওয়া হয়, তা ধ্বংস ডেকে আনে।”
অর্থাৎ গণতন্ত্রের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ, যখন তা নীতিনিষ্ঠ ও দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।
ভারতের রাজনীতিতে একসময় অনেক নেতাই আদর্শের টানে দল পরিবর্তন করেছিলেন— যেমন বি.আর. আম্বেদকর, যিনি দল বদল করেছিলেন সামাজিক ন্যায়ের দাবিতে। কিন্তু আজকের অনেক রাজনীতিক দল বদল করেন শুধুই ক্ষমতার টানে— যেখানে আদর্শ নয়, ব্যক্তিগত লাভই হয়ে ওঠে লক্ষ্য।
নৈতিকতার বিচারে রাজনৈতিক দলত্যাগ:
নীতিহীন দলত্যাগ শুধু রাজনৈতিক চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং জনগণের ভোটাধিকারকেও অবমাননা করে।
জন লক বলেছিলেন—
“শাসক জনগণের প্রতিনিধি, জনগণের মালিক নয়।”
তাহলে একজন প্রতিনিধি যদি নিজের স্বার্থে দলের পতাকা বদলে ফেলেন, তবে তিনি আসলে জনগণের বিশ্বাসের পতাকা নামিয়ে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে কিছু সেনেটর দল বদল করেছিলেন জনগণের কল্যাণমূলক ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাতে — যা ইতিহাসে নৈতিক সাহস হিসেবে প্রশংসিত।
অন্যদিকে আফ্রিকার কিছু দেশে একই কাজ করা হয় সুবিধা ও প্রলোভনের কারণে— যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশেও এমন উদাহরণ অজস্র, যেখানে একদিনের বিরোধী নেতা পরদিন সরকারের প্রশংসক হয়ে ওঠেন। তাদের যুক্তি— “দেশের উন্নয়নের স্বার্থে।” কিন্তু জনমনে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই উন্নয়ন কি জনগণের, নাকি ব্যক্তির?
মনুষ্যত্ব বনাম রাজনীতি:
রাজনীতি যদি মনুষ্যত্ব হারায়, তবে তা কেবল ক্ষমতার বাজারে পরিণত হয়।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন—
“রাজনীতি তখনই মহৎ হয়, যখন তা মানুষের জীবনে ন্যায় ও মর্যাদা আনে।”
অন্যদিকে যখন দল পরিবর্তন হয় অন্যের কষ্টে হাসার জন্য, তখন তা মনুষ্যত্বকে মেরে ফেলে।
বুদ্ধ বলেছেন—
“যে মানুষ নিজের অন্তরের সত্যের বিরুদ্ধে চলে, সে নিজেকেই ধ্বংস করে।”
অর্থাৎ দল বদল তখনই মানবিক, যখন তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতীক হয়; আর অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে গেলে তা মনুষ্যত্বের পরাজয়।
দল বদল গণতন্ত্রে নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু তানৈতিক দায়বদ্ধতার পরীক্ষায় টিকতে হয়।
যেখানে দল বদল হবে নীতি ও মানবকল্যাণের জন্য, সেখানে তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।
কিন্তু যদি তা হয় লাভ, ক্ষমতা ও প্রলোভনের জন্য, তবে তা গণতন্ত্রের আত্মাকে হত্যা করবে।
গণতন্ত্রের আসল শক্তি দল নয়, মানুষ; আর মানুষ তখনই শ্রদ্ধার যোগ্য, যখন তার মনুষ্যত্ব রাজনীতির চেয়ে বড় থাকে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com