বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা কয়েকটি যুদ্ধের নাম নয়—এটি অসংখ্য সাধারণ মানুষের অসাধারণ ত্যাগের গল্প। যাদের অনেকেই আজও রয়ে গেছেন আলোচনার আড়ালে। মুক্তিযোদ্ধা রশিদ মন্ডল তেমনই একজন মানুষ, যিনি প্রচারের আলো নয়, বরং নীরব দেশপ্রেম আর মানবসেবার মধ্য দিয়ে আজীবন বহন করে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তার জীবন কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সততা, ত্যাগ আর মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত পরিচয়।
সাক্ষাৎকার
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের সেই উত্তাল সময়ের কথা মনে পড়লে আজও কী অনুভব করেন?
রশিদ মন্ডল:
সময়টা ছিল ভয়ংকর, কিন্তু মনোবল ছিল দৃঢ়। চারদিকে আগুন, লাশ আর কান্না—তার মধ্যেও স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন চোখে ভাসত। পরিবারকে রেখে যুদ্ধে যাওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু দেশের জন্য কিছু না করলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না।
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নিলেন?
রশিদ মন্ডল:
পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন নিজের চোখে দেখেছি। গ্রামের নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া—এসব আমাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তখন বুঝেছি, চুপ থাকা মানেই অন্যায়ের সঙ্গে থাকা। তাই জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে নামি।
প্রশ্ন: যুদ্ধকালীন কোনো বিশেষ ঘটনা যা আজও আপনার চোখ ভিজিয়ে দেয়?
রশিদ মন্ডল:
একবার গভীর রাতে কয়েকজন নারী ও শিশুকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিই। পথে শত্রুর গুলির শব্দ শুনে সবাই ভয়ে কাঁপছিল। আমি শুধু বলেছিলাম—“ভয় পেও না, আমরা আছি।” আজও মনে হয়, সেদিন যদি একটু দেরি হতো, অনেক প্রাণ হারিয়ে যেত।
প্রশ্ন: সহযোদ্ধাদের কথা মনে পড়লে কী মনে হয়?
রশিদ মন্ডল:
অনেকেই আর বেঁচে নেই। তাদের মুখগুলো আজও চোখের সামনে ভাসে। তারা শহীদ হয়েছে, আর আমরা বেঁচে আছি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, তাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখা।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর আপনার জীবন কেমন কেটেছে?
রশিদ মন্ডল:
স্বাধীনতার পর আমি সাধারণ জীবনেই ফিরে আসি। কখনো মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে কিছু চাইনি। মানুষের উপকার করতে পারলেই সেটাই আমার বড় অর্জন মনে করেছি।
প্রশ্ন: আপনি এখনো সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন—এই শক্তি কোথা থেকে পান?
রশিদ মন্ডল:
মানুষের ভালোবাসা থেকেই শক্তি পাই। যখন দেখি কেউ উপকৃত হচ্ছে, তখন মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ সার্থক হয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার মতো আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন, যাদের গল্প আমরা জানি না—এ বিষয়ে কী বলবেন?
রশিদ মন্ডল:
এই দেশ অসংখ্য নীরব বীরের দেশ। তারা কখনো সামনে আসতে চাননি। কিন্তু তাদের সততা আর কর্মই আজও মুক্তিযোদ্ধার নামকে সম্মানিত করে রেখেছে।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মের প্রতি আপনার বার্তা কী?
রশিদ মন্ডল:
দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা হাতে ছবি তোলা নয়। সততা, দায়িত্ববোধ আর মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত দেশপ্রেম।
উপসংহার
মুক্তিযোদ্ধা রশিদ মন্ডলের জীবন আমাদের শেখায়—বীরত্ব সবসময় উচ্চকণ্ঠে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো নীরব ত্যাগই ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হয়ে ওঠে। তার মতো আরও অসংখ্য রশিদ মন্ডল আছেন, যারা আজও দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের হাত ধরেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বেঁচে থাকবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com