ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মরদেহ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে আজ শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় শোক উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতেও একইভাবে শোক পালন করা হচ্ছে।
আজ বেলা দুইটায় রাজধানীর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শরিফ ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে জানানো হয়, হাদির মরদেহ বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি শুক্রবার বিকেল ৫টা ৪৮ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে কফিন নামানোর সময় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
এ সময় স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে আরও জানানো হয়, জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের কোনো ধরনের ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সংসদ ভবন ও এর আশপাশের এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ইনকিলাব মঞ্চ এক ফেসবুক পোস্টে জানায়, পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শরিফ ওসমান হাদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সমাহিত করা হবে। এ উপলক্ষে মিছিল সহকারে তাঁর মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নেওয়া হবে।
এদিকে, হাদি হত্যার বিচার এবং ভারতীয় আধিপত্যের অবসানের দাবিতে শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ করে ইনকিলাব মঞ্চ, ডাকসুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। সমাবেশে বক্তারা স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন। এ সময় ডাকসুর ভিপি শাহবাগ মোড়কে ‘শহীদ ওসমান হাদি চত্বর’ ঘোষণা করেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় শরিফ ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা। প্রথমে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
স্বাস্থ্যের আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৫ ডিসেম্বর তাঁকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১০টার দিকে তিনি মারা যান।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ১১টার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আজ রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, নিহত শরিফ ওসমান হাদির স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করবে।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বাসিন্দা শরিফ ওসমান হাদি শুরুতে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী বক্তব্যের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে তিনি আলোচনায় আসেন। মাদ্রাসার শিক্ষক বাবার সন্তান হাদি নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইনকিলাব মঞ্চ গঠন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন হাদি। জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণার দাবিতে তিনি শাহবাগে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন। নিয়মিত টেলিভিশন টক শোতেও অংশ নিতেন তিনি। প্রথমে মুখপাত্র হলেও পরে সংগঠনটির আহ্বায়কের দায়িত্ব নেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবি, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিসহ বিভিন্ন আন্দোলনে তাঁকে সরব দেখা যায়। তিনি ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার এক মাস আগেই হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন হাদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাঁকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও তিনি ‘ইনসাফের লড়াই’ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com