জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত হচ্ছে নতুন সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সংসদ সদস্যরা আজ সকালে শপথ নেবেন এবং বিকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান ও তাঁর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করবেন।
প্রথা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করাবেন। আর সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।
নিরঙ্কুশ জয় ও নতুন সরকারের রূপরেখা
১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্যরা পেয়েছে ৮টি আসন। দুটি আসনের ফল স্থগিত রয়েছে এবং শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে নির্বাচন হয়নি।
একই দিনে জুলাই সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংবিধান সংশোধন পরিষদের শপথেরও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন।
ছোট কিন্তু সমন্বিত মন্ত্রিসভা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের ভাষ্যমতে, নতুন মন্ত্রিসভা হবে তুলনামূলক ছোট আকারের এবং নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে গঠিত। দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয়, দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। জোটের শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিরাও মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন।
শপথের পরপরই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দপ্তর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারি করবে।
শপথ অনুষ্ঠান: ঐতিহ্য ভেঙে নতুন আয়োজন
সকাল ১০টায় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে এমপিরা তিন দফায় (প্রতি দফায় ১০০ জন করে) শপথ নেবেন। বিকাল ৪টায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেবেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বঙ্গভবনের বাইরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠিত হচ্ছে—দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে এ আয়োজন করা হয়েছে বিএনপির পছন্দ অনুযায়ী।
২৬ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হতে পারে।
নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি
শপথ অনুষ্ঠানকে ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। বিপুলসংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। সংসদ ভবনের বাইরে লাইভ স্ক্রিন স্থাপন করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামত করে নতুন সাজে প্রস্তুত করা হয়েছে সংসদ ভবন। দক্ষিণ প্লাজায় অস্থায়ী মঞ্চ, ভিভিআইপি জোন, অতিথি গ্যালারি ও গণমাধ্যম কর্নার তৈরি করা হয়েছে।
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক প্রস্তুতি
শপথ অনুষ্ঠান উপলক্ষে রাজধানীর কিছু সড়কে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত যানচলাচল নিয়ন্ত্রিত থাকবে। খেজুরবাগান ক্রসিং থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং গণভবন ক্রসিং থেকে উড়োজাহাজ ক্রসিং পর্যন্ত লেকরোডে বিশেষ ডাইভারশন কার্যকর থাকবে।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নিয়ে জল্পনা
নতুন প্রধানমন্ত্রী কোথায় থাকবেন—তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ‘গণভবন’ বর্তমানে জুলাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত। সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে ‘যমুনা’ বা হেয়ার রোডের ৩০ নম্বর ভবন আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই।
দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে অবস্থানের পর দেশে ফিরে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ষষ্ঠবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের পর এবার নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়।
আজকের শপথ অনুষ্ঠান শুধু সরকার গঠন নয়—বরং একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com