ঢাকার শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালু করা ও বকেয়া বেতন-ভাতাসহ সব পাওনা পরিশোধের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে নাসা গ্রুপের শ্রমিকরা। বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহ সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন তারা। এতে উক্ত এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় এবং চরম দুর্ভোগে পড়েন সড়ক ব্যবহারকারীরা।
শ্রমিকদের শান্ত করতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে তাদের অনুরোধ উপেক্ষা করে শ্রমিকরা সড়ক ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশ জলকামান ও লাঠিচার্জের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনার দাবিতে উত্তেজিত শ্রমিকরা সকাল থেকে রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। তারা বলেন, “আমাদের পেটে ভাত নেই, অথচ মালিকপক্ষ অফিস বন্ধ করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাদের আগস্ট মাসের বেতন এখনো দেয়নি, সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলল। আবার জানিয়ে দিয়েছে, ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সব কারখানা বন্ধ থাকবে।”
নাসা গ্রুপের অধীনে থাকা প্রায় ১৬টি কারখানার কয়েক হাজার শ্রমিক এই বিক্ষোভে অংশ নেন। এদের মধ্যে অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আশুলিয়ায় বাস করছেন, যাদের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার (২৩ সেপ্টেম্বর) কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরে মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সরকারের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি ত্রি-পক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে জানানো হয়, চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং পর্যাপ্ত বায়ারের অর্ডার না থাকায় আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সাময়িকভাবে কারখানার সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
বৈঠকে মালিকপক্ষ চুক্তি অনুযায়ী আশ্বাস দেয়—
আগস্ট মাসের বেতন পরিশোধ করা হবে ১৫ অক্টোবরের মধ্যে,
সেপ্টেম্বর মাসের বেতন দেওয়া হবে ৩০ অক্টোবরের মধ্যে,
এবং সব ধরনের অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হবে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে।
তবে এই আশ্বাস শ্রমিকদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তারা বলছে, "ভবিষ্যতের কথা বাদ দেন, এখন আমাদের সংসার চালানোর টাকা নেই। বাচ্চার স্কুল ফি দিতে পারিনি, দোকানে বাকির পাহাড়।" এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না বলে জানান আন্দোলনকারী শ্রমিকরা।
শিল্প পুলিশ-১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া সাংবাদিকদের জানান, "সকাল থেকে বাইপাইল-আব্দুল্লাহ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আমরা চেষ্টা করছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণভাবে সরিয়ে দিতে বলা হয়, কিন্তু তারা অবরোধ অব্যাহত রাখে। পরে বাধ্য হয়ে জলকামান ও লাঠিচার্জের মাধ্যমে সড়ক পরিষ্কার করা হয়।"
তিনি আরও বলেন, কোনো প্রাণহানি বা গুরুতর আহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে পরিস্থিতি এখনও উত্তেজনাপূর্ণ। পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সড়ক অবরোধের ফলে সকাল থেকেই বাইপাইল ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী কর্মচারী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সসহ সাধারণ মানুষ পড়ে চরম ভোগান্তিতে। এক পথচারী বলেন- ১০ মিনিটের পথ যেতে দুই ঘণ্টা লেগেছে। রাস্তার দুই পাশে গাড়ির লাইন, মানুষ হাঁটতেও পারছে না।
ব্যবসায়ীরা জানান, এই ধরনের আন্দোলন শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তবে তারা শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল বলেও জানান।
নাসা গ্রুপের একাধিক শ্রমিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা বারবার মালিকপক্ষকে বলেছি—আমরা কাজ করতে চাই, বেতন চাই, ভাঙচুর বা সহিংসতা চাই না। কিন্তু আমাদের সংসার চালাতে হলে টাকাও দরকার। যদি আমাদের দাবি পূরণ না হয়, তাহলে আমরা আরও কঠিন কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”
শ্রমিকরা আরও বলেন, মালিকপক্ষ যদি মনে করে তারা কারখানা বন্ধ করে বিদেশ চলে যাবে আর আমাদের না খাইয়ে মারবে—তা হবে না। আমরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করব, প্রয়োজনে সড়ক আরও সময় বন্ধ রাখব।
এর আগেও, নাসা গ্রুপের শ্রমিকরা কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে আশুলিয়ায় মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু কোনো স্থায়ী সমাধান না আসায় শ্রমিক অসন্তোষ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
নাসা গ্রুপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ নাম হলেও, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাবের কারণে প্রতিষ্ঠানটি এখন গভীর সংকটে রয়েছে। অন্যদিকে, শ্রমিকরাও চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে।
এই সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের আন্তরিকভাবে বসে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছানো প্রয়োজন, যাতে করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত রক্ষা পায় এবং হাজারো শ্রমিকের ভবিষ্যত নিরাপদ হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com