রাজধানীর পুরান ঢাকার বাবুবাজার ও নয়াবাজার ব্রিজ সংলগ্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতাল এলাকাটি এখন কার্যত দখলদারদের কবলে। হাসপাতাল ঘিরে থাকা সড়ক, ফুটপাত ও হাসপাতালের চারপাশের বাউন্ডারি লাইন দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে পুরনো লোহা ও স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীরা।
অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই অবৈধ দখল এখন এক ভয়াবহ জনদুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, শিক্ষার্থী এমনকি জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরাও। অথচ এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সিটি করপোরেশন, পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
গত বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, নয়াবাজার ব্রিজ থেকে শুরু করে মহানগর হাসপাতালের পাশ ঘেঁষে ডিআইটি লেন, বংশাল বাগডাশসা লেন হয়ে আহমেদ বাণী স্কুল পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে লোহা-স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীদের দোকান ও মালামাল ছড়িয়ে রয়েছে।
হাসপাতালের চারপাশ ঘিরে থাকা সীমানা প্রাচীরের গা ঘেঁষে রাখা হয়েছে লোহার গেট, পাইপ, রডসহ নানা ধরণের পুরনো ধাতব সামগ্রী। শুধু তাই নয়, ড্রেন, ফুটপাত এমনকি চলাচলের রাস্তার বড় একটি অংশ দখলে চলে গেছে। এমনকি পাশেই অবস্থিত হাম্মাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়াল ঘেঁষেও দোকান বসানো হয়েছে।
এসব দোকানে ব্যবসায়ীরা ভেতরের জায়গা ছাড়াও বাইরের রাস্তাজুড়ে মালামাল রাখায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই এলাকা একসময় খোলা মাঠ ছিল, যেখানে শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলা করত। প্রায় ৫০ বছর আগে এখানে প্রথম কয়েকটি লোহা ও স্ক্র্যাপের দোকান বসানো হয়। পরে মহানগর হাসপাতাল নির্মিত হলে, ব্যবসায়ীদের মাঠ থেকে সরিয়ে হাসপাতালের দেয়ালের পাশে স্থায়ীভাবে দোকান বসানো হয়।
ধীরে ধীরে এই দোকান সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন পুরো হাসপাতালের চারপাশ, আশপাশের রাস্তা ও ফুটপাত দখলে চলে গেছে।
একজন ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা বলেন-
সকাল-বিকেল যানজট লেগেই থাকে। রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতে পারি না। স্কুলের বাচ্চারা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করে। অথচ কেউ কিছু বলে না।
এলাকার এক পথচারী বলেন-
এটা হাসপাতালের এলাকা। এখানে রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এটা শুধু জনদুর্ভোগ নয়, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন।
অনেকে বলেন, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স বা রোগীবাহী গাড়ি আনতে অসুবিধা হয়। বিশেষ করে যখন বড় ট্রাক আসে লোহার পণ্য আনলোড করতে, তখন পুরো সড়কই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
একজন ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, জানান-
আগে আওয়ামী লীগের সময় দিপু নামে একজন নিয়মিত চাঁদা নিত। এখন সরাসরি চাঁদা নেই, তবে আমরা এখানেই বসে আছি। সমস্যা হয় যখন বড় ট্রাক আসে। আমরা যতটা সম্ভব দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য এঙ্গেল বসিয়ে রাখি।
তিনি দাবি করেন, তারা অনেক আগে থেকেই এখানে ব্যবসা করছেন এবং ‘সবাই জানে’ তারা এখানে বসে আছেন।
ঢাকা মহানগর জেনারেল হাসপাতালের রেসিডেন্ট ফিজিসিয়ান ডা. মো. আশরাফুল হাসান বলেন-
হাসপাতালের পাশ দিয়ে চলাচল করতেও আমাদের অসুবিধা হয়। রোগী ও পথচারীরা প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাফেরা করেন। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। লোহার পাইপ ও গেট দেয়ালের পাশে ফেলে রাখায় ধসে পড়ারও ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সিটি করপোরেশনকে একাধিকবার অবহিত করা হয়েছে। তারা দু-একবার এসে পরিদর্শন করেছে এবং নতুন বাউন্ডারি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
ডা. আশরাফুল বলেন- হাসপাতাল হিসেবে আমরা শুধুমাত্র অভিযোগ জানাতে পারি। সরাসরি ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা হাছিবা খান বলেন-
“এ বিষয়ে আমরা খুব শিগগিরই সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। পরে বিস্তারিত তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তবে এলাকাবাসী বলছে, এই ধরণের ‘দেখা হবে’, ‘পরে ব্যবস্থা নেয়া হবে’ কথাগুলো অনেক বছর ধরেই শুনে আসছেন তারা, কিন্তু বাস্তবে কাজ হয় না।
বংশাল ও বংশাল সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-
“৫০ বছর ধরে এই জায়গা দখলে, অথচ এত বছরেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান হলো না। এটা খুবই দুঃখজনক। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা আসলে কী দেখছেন?”
তাদের প্রশ্ন,
“ঢাকা মহানগর হাসপাতালের সামনে রাস্তা ও ফুটপাত কবে মুক্ত হবে? প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কবে আসবে?”
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে, তাও একটি সরকারি হাসপাতালের চারপাশ এমনভাবে দখল হয়ে যাওয়া দেশের নগর ব্যবস্থাপনার জন্য এক করুণ চিত্র তুলে ধরে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলা বা নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা নয়, এটি জনসুরক্ষা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অবহেলা।
যেখানে জরুরি চিকিৎসা পাওয়ার জন্য রোগীরা হাসপাতালমুখী হন, সেই পথেই যদি মৃত্যু ফাঁদ পেতে থাকে- তবে সেই নগর ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই যৌক্তিক। এখন সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর পদক্ষেপে যাওয়ার।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com