বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এলাকায় মাদক পাচারের অন্ধকার জাল বিস্তারের প্রচেষ্টা নির্মূল করতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তৎপরতা আবারও ফলপ্রসূ হয়েছে। সোমবার সকালে টেকনাফ উপজেলার সমুদ্রসৈকত এলাকায় একটি গোপন অভিযানে কোস্ট গার্ড বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ একজন কুখ্যাত মাদক পাচারকারীকে আটক করে। এই অভিযানে আটক হন রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ক্যাম্পের সংলগ্ন এলাকায় সক্রিয় মাদক ব্যবসায়ী আব্দুল করিম (৩৮), যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া উইংের পরিচালক, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক সোমবার সকাল ০৯ টার দিকে একটি সংবাদ সম্মেলনে এই ঘটনার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, অভিযানের সময় কোস্ট গার্ডের দক্ষীণ-পূর্ব অঞ্চলের টাস্ক ফোর্স ইউনিট গতকাল রাত থেকে টেকনাফের নৌকাবন্দর এলাকায় নজরদারি চালু করে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, মিয়ানমার থেকে সামুদ্রিক পথে ইয়াবা সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে করিম নিয়মিত এই বিষাক্ত ড্রাগস দেশে প্রবেশ করাচ্ছিল। অভিযানকারীদের নাগালে পড়ার সময় করিম একটি ছোট নৌকায় ইয়াবা লোড করে সমুদ্রের দিকে পলায়নের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু কোস্ট গার্ডের দ্রুতসঞ্চারী নৌকা এবং তাকে ঘিরে ফেলা হয় এবং নিরস্ত্র করে আটক করা হয়।
আটকের সময় করিমের নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় কয়েক হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ৫ লাখ টাকা। এছাড়া, অভিযানে বাজেয়াপ্ত হয়েছে দুটি অস্ত্র, ৫০ হাজার টাকা নগদ অর্থ এবং একটি মোবাইল ফোন, যাতে মিয়ানমার-ভিত্তিক পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক আরও বলেন, এই অভিযানটি আমাদের 'অপারেশন ক্লিন সি' এর অংশ, যার লক্ষ্য বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে মাদক প্রবেশ রোধ করা। গত এক বছরে এই অঞ্চলে আমরা ২ কোটি টাকার বেশি মাদকজাত পণ্য বাজেয়াপ্ত করেছি, যা যুবসমাজকে এই বিষের মুক্ত রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টেকনাফ এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক পাচারের হটস্পট হিসেবে পরিচিত। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোর কাছাকাছি অবস্থানের কারণে এখানে সীমান্ত পারাপার করে ইয়াবা, হেরোইন এবং গাঁজা প্রবেশ করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই পাচার নেটওয়ার্ক যুবকদের মধ্যে বিষব্যসন ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। টেকনাফ থানার ওসি জানান, আটক করিমের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে। তদন্তে আরও কয়েকজন স্থানীয় সহযোগীদের জড়িত থাকার সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
কোস্ট গার্ডের এই সফলতা শুধুমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য। মাদক পাচারের মাধ্যমে জড়িত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলো প্রায়শই সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলে। সরকারের 'মাদকমুক্ত বাংলাদেশ' প্রচারণার প্রেক্ষাপটে এমন অভিযানগুলো যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে আশার আলো জ্বালাচ্ছে। স্থানীয় এনজিও 'যুব উন্নয়ন ফাউন্ডেশন'-এর নির্বাহী পরিচালক ফাতেমা বেগম বলেন- এই ধরনের অভিযান যুবকদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করবে। আমরা কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতা কর্মসূচি চালাব।
এই ঘটনা টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার করেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন যে, এমন অভিযানগুলো অব্যাহত থাকলে এলাকাটি সত্যিই মাদকমুক্ত হয়ে উঠবে। কোস্ট গার্ডের কর্মীরা জানান, আগামী দিনগুলোতে আরও কঠোর নজরদারি চালানো হবে। এই সাফল্য দেশব্যাপী মাদক নির্মূল অভিযানকে নতুন গতি প্রদান করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com