রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের (রেজি নং ২১৪২) আসন্ন ২০২৬-২০২৭ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সভাপতি পদের প্রার্থী জুবায়ের ইবনে রাসেলের নেতৃত্বে একদল বহিরাগত লোক ফর্ম সংগ্রহের চেষ্টা করলে রাজউকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এ ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাই শেখ শাহিনের ঘনিষ্ঠ সহচর বলে পরিচিত জুনায়েদ ইবনে শরিফ (রাসেল), যার বিরুদ্ধে রাজউকের ডেপ প্রকল্পে নকশা জালিয়াতি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, দেড় বছর আগে রাজউকের অনলাইন সিস্টেম থেকে ৩৫ হাজার নথি গায়েব হওয়ার ঘটনায়ও জুনায়েদের নাম জড়িয়েছে অভিযোগকারীরা। এসব অভিযোগ রাজউকের দীর্ঘদিনের দুর্নীতির ইতিহাসকে নতুন করে উন্মোচন করেছে, যা বর্তমান সরকারের দুর্নীতি দমন অভিযানের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে।
রাজউক কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি একটি নিবন্ধিত সংস্থা, যা রাজউকের কর্মচারীদের কল্যাণমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করে। এই সমিতির নির্বাচন প্রক্রিয়া সাধারণত শান্তিপূর্ণ হলেও, গতকাল (৮ অক্টোবর) ঘটনাটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সূত্রমতে, সভাপতি পদের প্রার্থী জুবায়ের ইবনে রাসেল প্রায় ১০০ জনের একটি দল নিয়ে রাজউকের অফিস কমপ্লেক্সে ফর্ম সংগ্রহের জন্য হানা দেন। তারা আওয়ামী লীগের দোসর বঙ্গবন্ধু পরিষদ রাজউক শাখার যুগ্ম সম্পাদকের নেতৃত্বে ছিলেন বলে অভিযোগ। রাজউকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এতে বাধা দেওয়ায় উত্তেজ
না ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগকারীদের মতে, বহিরাগত এই দলকে 'সন্ত্রাসী' বলে অভিহিত করে কর্মচারীরা তাদের তাড়িয়ে দেয়। পরে পুলিশের পাহারায় তারা স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সমিতির নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। একজন অভিযোগকারী কর্মচারী বলেন, "আমরা শুধু আমাদের অধিকার রক্ষা করতে চাই। এরা বাইরের লোক নিয়ে এসে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চায়।" সমিতির একজন পুরনো সদস্য যোগ করেন, "জুবায়েরের পক্ষে জুনায়েদের ভূমিকা স্পষ্ট। তিনি শেখ শাহিনের ঘনিষ্ঠ সহচর, এবং তার দুর্নীতির অতীত আমরা জানি।" এই অভিযোগগুলো ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রথম প্রকাশিত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক ঘটনার সাথে সরাসরি যুক্ত।
জুনায়েদ ইবনে শরিফের নাম রাজউকের দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে অনেক আগে থেকে। তিনি রাজউকের সহকারী জিআইএস অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন, কিন্তু অভিযোগ অনুসারে, সাবেক সরকারের আমলে শেখ শাহিনের মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে, রাজউকের ডেপ (ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান) প্রকল্পে নকশা জালিয়াতি করে ৫০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গোপালগঞ্জে শেখ হাসিনার ভাই শেখ শাহিনের সাথে বিয়ে করে তিনি পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বৈরাচারী শাসনের নাম ব্যবহার করে ব্যাপক ঘুষের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে তার স্ত্রীর নামে তিন থেকে পাঁচ কাঠা পর্যন্ত একাধিক প্লট কেনা হয়েছে—নামে-বেনামে। সিরাজগঞ্জের তার দেশের বাড়িতে বিগত সরকারের আমলে বিঘা বিঘা জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ধানমন্ডি বসতব্যান্তরে প্লটের নকশা জালিয়াতি করে ১০ তলা বাড়ি নির্মাণের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগ রাজউকের প্লট বরাদ্দে দুর্নীতির বৃহত্তর চিত্রের অংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্তে উন্মোচিত হয়েছে। উল্লেখ্য, রাজউকের প্লট দুর্নীতিতে শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলসহ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে। এই মামলাগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্লট বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে, যা ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো দেড় বছর আগে রাজউকের অনলাইন সিস্টেম থেকে ৩৫ হাজার নথি গায়েব হওয়ার ঘটনা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাজউকের সার্ভার থেকে ভবন নির্মাণ অনুমোদনসংক্রান্ত প্রায় ৩০ হাজার গ্রাহকের নথি হারিয়ে যায়, যা পরে ৩৫ হাজারে পৌঁছায় বলে জানা গেছে। হাইকোর্ট এই ঘটনায় রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিল, কিন্তু কারণ এখনো স্পষ্ট হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, এর পিছনে জুনায়েদের হাত রয়েছে। তিনি জিআইএস অ্যানালিস্ট হিসেবে সিস্টেমের অ্যাক্সেস ছিল, এবং এই গায়েব নথিগুলোর মাধ্যমে দুর্নীতির প্রমাণ মুছে ফেলা হয়েছে। দুদকের তদন্তে রাজউকের ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোটি কোটি টাকার সম্পদ উন্মোচিত হয়েছে, যার মধ্যে অনিয়ম এবং ঘুষের ভূমিকা ছিল। একজন সাবেক কর্মচারীকে ৭ বছরের কারাদণ্ডসহ ৬ লাখ টাকা জরিমানা হয়েছে এই ধরনের মামলায়।
শেখ শাহিনের সাথে জুনায়েদের সম্পর্ক রাজউকের দুর্নীতির মূলে। শেখ শাহিন, যিনি রাজউকের সাবেক পরিচালক শেখ শাহিনুল ইসলাম হিসেবে পরিচিত, তার বিরুদ্ধে পূর্বাচল প্রকল্পে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ রয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা লিখিত অভিযোগ করেছেন যে, প্লট বরাদ্দের জন্য তাঁকে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়। এই অভিযোগ ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়। শেখ শাহিনের প্রভাবে জুনায়েদ রাজউকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে দাবি করা হচ্ছে। সমবায় সমিতির নির্বাচনে তারা আবার সক্রিয় হয়েছে, যা কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। সমিতির ১০৯ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগও উঠেছে, যা অডিট রিপোর্টে উল্লেখিত।
রাজউকের কর্মচারীরা এখন দাবি করছেন যে, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে হবে এবং বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। একজন কর্মচারী বলেন, "আমরা শুধু নিরপেক্ষ নির্বাচন চাই। দুর্নীতিবাজদের প্রভাবে আমাদের কল্যাণকারী সমিতি ধ্বংস হয়ে যাবে।" দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, "এই অভিযোগগুলো তদন্তাধীন। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" রাজউক কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো বক্তব্য দেননি, কিন্তু সমিতির নির্বাচনী কমিশন পুলিশের সহায়তায় নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্থাগুলোতে দুর্নীতির গভীরতা তুলে ধরেছে। সাবেক সরকারের আমলে রাজউককে 'আলাদীনের চিরাগ' বলে অভিহিত করা হতো, যেখানে ঘুষ এবং প্রভাবের মাধ্যমে সব সম্ভব ছিল। বর্তমানে দুদকের তদন্তে ৬টি মামলা চলছে শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে, যা প্লট বরাদ্দের অনিয়ম নিয়ে। এর মধ্যে জুনায়েদের মতো মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা উন্মোচিত হলে আরও বড় কেলেঙ্কারি হতে পারে। কর্মচারীদের প্রতিবাদ এবং অভিযোগগুলো যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে রাজউকের পুনর্গঠনের প্রশ্ন উঠবে। দেশের উন্নয়ন সংস্থাগুলোতে স্বচ্ছতা না এলে জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না। এই নির্বাচনী ঘটনা শুধু সমিতির নয়, বৃহত্তর প্রশাসনিক সংস্কারের সংকেত।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com