নারীর সমানাধিকার : বৈষম্য নিরসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় করণীয়
১৫ মার্চ ২০২৬, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কনফারেন্স হল, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা
ধারণাপত্র
৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মারক। এটি কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান পর্যালোচনা করার এবং নতুন করে অঙ্গীকার করার সময়। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে অধিকার কেবল কাগুজে বিষয় হয়ে থাকলে চলে না, কারণ ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া সেই অধিকার বাস্তব জীবনে অর্থবহ হয়ে ওঠে না।
দীর্ঘ পথপক্রিমায় বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও সামাজিক-অর্থনেতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদের অস্থিরতা অনেক ক্ষেত্রে তা ম্লান করে দিয়েছে। সার্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারীরা এখনো কাঠামোগত বৈষম্য, সহিংসতা এবং অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীরা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। এবারের নারী দিবস আমাদের আহ্বান জানায় এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে সামনে এগিয়ে যেতে। কারণ নারী ও মেয়েদের অধিকার তাদের জন্মগত মানবাধিকার।
ইউএন উইমেন-এর তথ্য অনুযায়ী, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের কোনো দেশ নারী ও পুরুষের মধ্যে আইনগত বৈষম্য পুরোপুরি দূর করতে পারে নি। ২০২৬ সালের হিসেবে বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে মাত্র ৬৪ শতাংশ আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারছে। এখনো কাজ, আয়, নিরাপত্তা, পরিবার, সম্পত্তি, চলাচল, ব্যবসা এবং অবসর- জীবনের এসব মৌলিক বিষয়ে আইন ও সামাজিক চর্চা অনেক সময় নারীর বিপক্ষে কাজ করে। কোথাও আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই । কোথাও আবার ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি ও ভ্রান্ত ধারণা নারীর অধিকার অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে। সংস্থাটি দেখিয়েছে, এই গতিতে অগ্রগতি হলে নারী-পুরুষের মধ্যে আইনগত সুরক্ষার ব্যবধান ঘুচাতে আরও ২৮৬ বছর লাগবে। এই অবস্থা জানবার পরও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা মানে হলো বিরূপ পরিস্থিতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ।
বাংলাদেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রীতিমতো হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। এই নির্বাচনে মোট ২০২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮৭ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাঁদের মধ্যে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন। অন্যদিকে মাত্র ৩ জন নারী মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিবর্তে আমরা ক্রমশ পেছনের দিকে যাচ্ছি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কমপক্ষে ৫ শতাংশ আসনে নারীপ্রার্থীদের মনোনয়ন দেবার শর্ত ছিল। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করে নি, যদিও এবারের নির্বাচনে ভোটারদের ৪৯.২৪ শতাংশই ছিল নারী। বর্তমান সরকারের প্রধান শরিক দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে নারীপ্রার্থীদের মনোনয়ন দিলেও ৫ শতাংশের শর্ত তারাও পূরণ করে নি। অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল কোনো নারীপ্রার্থীকেই মনোয়ন দেয় নি । অর্থাৎ, মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেই নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, বিজয়ী হওয়া না হওয়া তো আরো পরের প্রশ্ন। এটা ঠিক যে, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া শুধু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তবে অন্য সকল ক্ষেত্রের বৈষম্য কমাতে পারে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নীতি নির্ধারণী
ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ। পরিবার ও দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য কমবে না এবং প্রতিনিয়ত নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
আমাদের নারীরা ঘরে ও বাইরে প্রতিনিয়ত সহিংসতা, হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হন। কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশ এখনো অনেক নারীর জন্য অধরা। বিচারব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার না থাকা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না থাকা, সামাজিক চাপ এবং ভয়ের সংস্কৃতি নারীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে অধিকার থাকলেও ন্যায্যতা নিশ্চিত না হলে সেই অধিকার কার্যকর হয় না। একই সঙ্গে বলা যায় যে, কার্যকর ও মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পর্যাপ্ত আইন, নীতি ও কৌশল থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাষ্ট্রের আইন, নীতি ও কৌশলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা জাতীয় সংসদে যৌক্তিক সংখ্যক নারী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারি নি। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো নারীর অর্থবিত্ত ও প্রভাব না থাকা, সংযোগ ও দেনদরবার করার সুযোগ কম থাকা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যোগ্য নারীকর্মীরাও মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ-কর্মশালা আয়োজনে দলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীকে যুক্ত করা। শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক পরিসরে লিঙ্গসমতা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করাও জরুরি। নইলে এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
মনে রাখতে হবে, গ্রাম ও শহরের নারী, শ্রমজীবী নারী, প্রতিবন্ধিতাসহ নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন, কিন্তু অধিকার সবারই সমান। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে এই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সবচেয়ে প্রান্তিক নারীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যখন একজন নারী নিরাপদ থাকে, শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং আইনি সুরক্ষা পায়, তখন একটি পরিবার শক্তিশালী হয় । আর শক্তিশালী পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ সমাজ। নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া; যা পুরো সমাজ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ।
নারীর সমান অধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বৈষম্যপূর্ণ আইনের পরিবর্তন এবং নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া, যাতে নারী ও মেয়েরা ভয়, বৈষম্য ও বঞ্চনা ছাড়াই তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। কারণ নারী ও মেয়েদের সমতা নিশ্চিত করা তাদের প্রতি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়, এটি একটি ন্যায়সংগত, মানবিক ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণের অপরিহার্য শর্ত। এপ্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের উদ্যোগে আজকের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন -যেখানে আপনারা জানাবেন, নারীরা কোনপথে হাঠবেন, কোথায় কি পরিবর্তন করা প্রয়োজন, কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সমতাপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ
গোলটেবিল বৈঠক
নারীর সমানাধিকার : বৈষম্য নিরসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় করণীয়
১৫ মার্চ ২০২৬, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কনফারেন্স হল, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা
ধারণাপত্র
৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্মারক। এটি কেবল উদযাপনের দিন নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান পর্যালোচনা করার এবং নতুন করে অঙ্গীকার করার সময়। ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য Rights. Justice. Action. For ALL Women and Girls আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে অধিকার কেবল কাগুজে বিষয় হয়ে থাকলে চলে না, কারণ ন্যায়বিচার ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া সেই অধিকার বাস্তব জীবনে অর্থবহ হয়ে ওঠে না।
দীর্ঘ পথপক্রিমায় বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও সামাজিক-অর্থনেতিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদের অস্থিরতা অনেক ক্ষেত্রে তা ম্লান করে দিয়েছে। সার্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারীরা এখনো কাঠামোগত বৈষম্য, সহিংসতা এবং অসম ক্ষমতা সম্পর্কের মধ্যে বসবাস করছে। অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং নিরাপত্তার প্রশ্নে নারীরা প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। এবারের নারী দিবস আমাদের আহ্বান জানায় এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে সামনে এগিয়ে যেতে। কারণ নারী ও মেয়েদের অধিকার তাদের জন্মগত মানবাধিকার।
ইউএন উইমেন-এর তথ্য অনুযায়ী, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পেরিয়ে গেলেও বিশ্বের কোনো দেশ নারী ও পুরুষের মধ্যে আইনগত বৈষম্য পুরোপুরি দূর করতে পারে নি। ২০২৬ সালের হিসেবে বিশ্বজুড়ে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গড়ে মাত্র ৬৪ শতাংশ আইনগত অধিকার ভোগ করতে পারছে। এখনো কাজ, আয়, নিরাপত্তা, পরিবার, সম্পত্তি, চলাচল, ব্যবসা এবং অবসর- জীবনের এসব মৌলিক বিষয়ে আইন ও সামাজিক চর্চা অনেক সময় নারীর বিপক্ষে কাজ করে। কোথাও আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই । কোথাও আবার ক্ষতিকর সামাজিক রীতিনীতি ও ভ্রান্ত ধারণা নারীর অধিকার অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করছে। সংস্থাটি দেখিয়েছে, এই গতিতে অগ্রগতি হলে নারী-পুরুষের মধ্যে আইনগত সুরক্ষার ব্যবধান ঘুচাতে আরও ২৮৬ বছর লাগবে। এই অবস্থা জানবার পরও নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা মানে হলো বিরূপ পরিস্থিতির কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ।
বাংলাদেশে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে রীতিমতো হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। এই নির্বাচনে মোট ২০২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৮৭ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যাঁদের মধ্যে নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন মাত্র ৭ জন। অন্যদিকে মাত্র ৩ জন নারী মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিবর্তে আমরা ক্রমশ পেছনের দিকে যাচ্ছি।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর কমপক্ষে ৫ শতাংশ আসনে নারীপ্রার্থীদের মনোনয়ন দেবার শর্ত ছিল। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দলই এই শর্ত পূরণ করে নি, যদিও এবারের নির্বাচনে ভোটারদের ৪৯.২৪ শতাংশই ছিল নারী। বর্তমান সরকারের প্রধান শরিক দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে নারীপ্রার্থীদের মনোনয়ন দিলেও ৫ শতাংশের শর্ত তারাও পূরণ করে নি। অন্যদিকে সংসদের প্রধান বিরোধী দল কোনো নারীপ্রার্থীকেই মনোয়ন দেয় নি । অর্থাৎ, মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেই নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে, বিজয়ী হওয়া না হওয়া তো আরো পরের প্রশ্ন। এটা ঠিক যে, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া শুধু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তবে অন্য সকল ক্ষেত্রের বৈষম্য কমাতে পারে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নীতি নির্ধারণী
ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ। পরিবার ও দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা না থাকলে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য কমবে না এবং প্রতিনিয়ত নারীর ক্ষমতায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
আমাদের নারীরা ঘরে ও বাইরে প্রতিনিয়ত সহিংসতা, হয়রানি এবং বৈষম্যের শিকার হন। কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও নিরাপদ পরিবেশ এখনো অনেক নারীর জন্য অধরা। বিচারব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার না থাকা, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না থাকা, সামাজিক চাপ এবং ভয়ের সংস্কৃতি নারীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এসব বাস্তবতা প্রমাণ করে যে অধিকার থাকলেও ন্যায্যতা নিশ্চিত না হলে সেই অধিকার কার্যকর হয় না। একই সঙ্গে বলা যায় যে, কার্যকর ও মানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়া পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পর্যাপ্ত আইন, নীতি ও কৌশল থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, রাষ্ট্রের আইন, নীতি ও কৌশলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও আমরা জাতীয় সংসদে যৌক্তিক সংখ্যক নারী উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারি নি। এর পেছনে একটি বড় কারণ হলো নারীর অর্থবিত্ত ও প্রভাব না থাকা, সংযোগ ও দেনদরবার করার সুযোগ কম থাকা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যোগ্য নারীকর্মীরাও মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হন। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব বিকাশে প্রশিক্ষণ-কর্মশালা আয়োজনে দলগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণীদের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা এবং তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীকে যুক্ত করা। শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক পরিসরে লিঙ্গসমতা নিয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করাও জরুরি। নইলে এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।
মনে রাখতে হবে, গ্রাম ও শহরের নারী, শ্রমজীবী নারী, প্রতিবন্ধিতাসহ নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা ভিন্ন, কিন্তু অধিকার সবারই সমান। একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে এই বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সবচেয়ে প্রান্তিক নারীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যখন একজন নারী নিরাপদ থাকে, শিক্ষিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয় এবং আইনি সুরক্ষা পায়, তখন একটি পরিবার শক্তিশালী হয় । আর শক্তিশালী পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে একটি সুস্থ সমাজ। নারী ও মেয়েদের ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া; যা পুরো সমাজ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ।
নারীর সমান অধিকারকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং সকল ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বৈষম্যপূর্ণ আইনের পরিবর্তন এবং নীতিগত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া, যাতে নারী ও মেয়েরা ভয়, বৈষম্য ও বঞ্চনা ছাড়াই তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে। কারণ নারী ও মেয়েদের সমতা নিশ্চিত করা তাদের প্রতি কোনো বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়, এটি একটি ন্যায়সংগত, মানবিক ও টেকসই সমাজ বিনির্মাণের অপরিহার্য শর্ত। এপ্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের উদ্যোগে আজকের গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন -যেখানে আপনারা জানাবেন, নারীরা কোনপথে হাঠবেন, কোথায় কি পরিবর্তন করা প্রয়োজন, কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সমতাপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ (বিএনপিএস)
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com