মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া ও রানাখড়িয়া সবজিপাড়া সরদার ঘাটে কোনো সরকারি ইজারা ছাড়াই পদ্মা নদী থেকে দিন-রাত অবৈধভাবে হচ্ছে বালু উত্তোলন। স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও নদীপথের সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন প্রায় অর্ধ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সরকার প্রতি মাসে হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব । পাশাপাশি অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদী তীরের জনবসতি এবং নিকটবর্তী কয়েকটি সেতুর স্থায়িত্ব নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে প্রতিদিন মোটা অংকের অর্থ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ বালু বাণিজ্য চালিয়ে আসছে এই সিন্ডিকেটটি। যদিও প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দৈনিক শতাধিক নৌকায় বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের দুটি স্থানের মধ্যে একটি তালবাড়িয়া ও রানাখড়িয়া সবজিপাড়া (সরদার ঘাট) থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি নৌকায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র জানায় , তালবাড়িয়া ও সরদার ঘাট থেকে অবৈধভাবে ভালো উত্তোলনকারী রেজন মণ্ডল, শামিম সাদ্দার, সাইফুল কবিরাজ, রাজা কবিরাজ, মিঠু চেয়ারম্যান ও রকি নামের কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট প্রতিদিন প্রায় ৬০টি নৌকায় বালু উত্তোলন করছে। প্রতিটি নৌকায় আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা মূল্যের বালু পরিবহন করা হয়। সে হিসাবে শুধু এই ঘাট থেকেই প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ টাকার বালু উত্তোলন হচ্ছে। অন্যদিকে রানাখড়িয়া সবজিপাড়া (সরদার ঘাট) থেকে প্রতিদিন গড়ে ৪০টি নৌকায় বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি নৌকার বালুর মূল্য প্রায় ৫০ হাজার টাকা হিসেবে এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুটি ঘাট মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ টাকার বালু দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, অবৈধ বালু উত্তোলনের পেছনে একটি রাজনৈতিক প্রভাবশালী একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, সাবেক তালবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হান্নান চেয়ারম্যানের মালিকানাধীন বালু আনলোডিং যন্ত্র ব্যবহার করেই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এ চক্রের সঙ্গে নদীপথের প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তালবাড়িয়া ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, সাইফুল কবিরাজ বলেন, আমি কোনো অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত নই। ঘাটটি অবৈধভাবে চলছে, এটা সত্য। তবে আমি এটি পরিচালনা করি না। হরিপুরের চাঁদ নামের একজন এটি পরিচালনা করেন। অপর অভিযুক্ত শামিম সাদ্দার বলেন, আমরা দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্লকের কাজ সাব-কন্ট্রাক্ট পেয়েছি। তাই নদীপথ থেকে বালু কিনে এনে আনলোড করছি। কে বা কারা নদী থেকে বালু তুলছে কিংবা সেটি বৈধ না অবৈধ—তা আমার জানা নেই। বিষয়টি প্রশাসনের দেখার। মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত আমান আজিজ বলেন, মিরপুর উপজেলায় কোনো বৈধ বালুমহাল নেই। সরকারিভাবে কোনো ঘাট ইজারা দেওয়া হয়নি। কেউ বালু উত্তোলন করলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুল ওয়াদুদ বলেন, তালবাড়িয়া বা সরদার ঘাট প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইজারা দেওয়া হয়নি। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন কে বা কারা অর্থ লেনদেন করছে, তা আমার জানা নেই। প্রশাসন এ ধরনের কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সেতু ও নদীতীর হুমকির মুখে পড়তে পারে। তারা অবিলম্বে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত মূল হোতা, সিন্ডিকেট সদস্য ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ । একই সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com