নদী সুরক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে কাজ হচ্ছে বহু বছর ধরে। তবে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, এসব প্রকল্পে অগ্রাধিকার, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন বা বাস্তব চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয় না। বরং বাজেট বণ্টন ও প্রকল্প গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করে রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তি বিশেষের পছন্দ কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র। ফলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হচ্ছে না, বরং অপচয় হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।
একটি বড় সমস্যার দৃষ্টান্ত হতে পারে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদঘেঁষা এলাকা। কয়েক দশক ধরে সীমাহীন ভাঙনের শিকার হলেও এখনো পর্যন্ত সেখানে কোনো কার্যকর বা স্থায়ী প্রকল্প নেওয়া হয়নি। অথচ অন্যত্র, যেখানকার প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে বড় বাজেটের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের বৈষম্য প্রকল্প বণ্টনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবের একটি বাস্তব উদাহরণ।
২০২১ সালের পর থেকে রংপুর বিভাগে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হয়নি। অথচ এ সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে অনেকগুলোর সমীক্ষা শেষ হলেও সেগুলো বছরের পর বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। কারণ, সেগুলো পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজপাতা’ পর্যায়ে উঠতেই পারছে না। ফলে একনেকে উঠার সুযোগও পাচ্ছে না।
এছাড়া প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে জেলা বা বিভাগীয় নদী রক্ষা কমিটির মতামতের কোনো মূল্য নেই। যদি এই কমিটিগুলো প্রকল্প গ্রহণে মত দিতে পারত, তাহলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন করা যেত এবং মাঠপর্যায়ে সঠিক সমস্যা নিরূপণ করে উদ্যোগ নেওয়া যেত।
বর্তমানে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি বড় সমস্যা হলো সমন্বয়হীনতা। পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং অন্যান্য দপ্তর একেক ডিজাইনে নদীর বিভিন্ন অংশে কাজ করছে। ফলে কোথাও একই নদীতে পরস্পরবিরোধী প্রকল্প গৃহীত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একক পরিকল্পনা ও কেন্দ্রীয় সমন্বয় জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে নদীবিষয়ক প্রকল্প গ্রহণে একটি নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। এই নীতিমালায় কেন্দ্র, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের সব প্রকল্পের সমন্বয়, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও পর্যালোচনার জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। সেই টাস্কফোর্সে নদী নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে শুধু অগ্রাধিকার ভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নই হবে না, ক্ষমতার অপব্যবহারও রোধ করা যাবে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি তিস্তা নদী সুরক্ষায় নিজ উদ্যোগে ২৪৩ কোটি টাকার বরাদ্দ নিশ্চিত করেছেন, যা তিস্তার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তাঁর নেতৃত্বে ধরলা নদী সংরক্ষণ প্রকল্প শিগগিরই সবুজপাতায় উঠতে পারে বলেও আশা করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রসহ রংপুর অঞ্চলের প্রকল্পগুলোতে নতুন করে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে।
একইসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করেছে। তবে নদীবিষয়ক অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি। তাই একটি কেন্দ্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন করে, সব মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল এবং জনস্বার্থে জরুরি প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের উন্নয়নে প্রতিটি টাকা যেন পরিকল্পিতভাবে ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প গ্রহণে ‘কে কোথা থেকে এসেছে’—এমন পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, ‘কোথায় প্রকৃত প্রয়োজনে’—সেই বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলে আর কেউ বলতে পারবে না, “চট্টগ্রামে অনেক উপদেষ্টা থাকায় সেখানে উন্নয়নের জোয়ার, আর রংপুরে না থাকায় প্রকল্প নেই।”
সর্বোপরি, নদী রক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকারভিত্তিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং জনস্বার্থকেন্দ্রিক প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। এতে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা পাবে, জনগণ উপকৃত হবে এবং রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় রোধ হবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com