আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে সক্রিয় হওয়ার নতুন কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশব্যাপী ‘ডোর টু ডোর’ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে দলটি। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় গিয়ে ভোটাধিকার, নিরপেক্ষ নির্বাচন এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের বার্তা পৌঁছে দেওয়া।
গত সোমবার রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, যিনি বৈঠকে সভাপতিত্বও করেন। উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতারা।
বিএনপির ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপন্থি দলগুলোর চলমান কর্মসূচি এবং সরকারঘনিষ্ঠ মহলের প্রচারের প্রেক্ষাপটে দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও নির্বাচনি প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই ‘ঘরোয়া কর্মসূচি’ নেওয়া হয়েছে। বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, “আমরা চাচ্ছি জনগণের কাছে সরাসরি যেতে, তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জানতে এবং আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে।”
এই কর্মসূচিকে প্রচার নয়, বরং সরাসরি জনসম্পৃক্ত রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছে দলটি। শুধুমাত্র পুরুষ নয়, নারীকর্মীদেরও এই কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিএনপি নেতাদের মতে, নির্বাচনের প্রাক্কালে নারীদের অংশগ্রহণ দলের ইমেজ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দল এবং গোষ্ঠী যেভাবে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠছে, তা মূলত চাপ তৈরির কৌশল হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভোটের ভারসাম্যে তার প্রভাব থাকবে না। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন- প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি দেওয়ার অধিকার আছে। তবে যদি এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য হয় বিভ্রান্তি ছড়ানো, তাহলে বিএনপি তার রাজনৈতিক জবাব দেবে মাঠ থেকেই।
এদিকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, “আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কিন্তু কেউ যদি ভাবেন এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটকে প্রভাবিত করবেন, সেটা বাস্তবসম্মত নয়। শেষ পর্যন্ত সব দলকেই নির্বাচনে অংশ নিতেই হবে।”
বৈঠকে বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখার আলোকে নির্বাচনি ইশতেহার দ্রুত চূড়ান্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। দলটি প্রতিটি সংসদীয় আসনে একক প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রার্থীদের এখন থেকেই মাঠে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
বিএনপির এক নেতা বলেন- আমরা অতীতে শৃঙ্খলার অভাব থেকে অনেক কিছু হারিয়েছি। এখন সেই শৃঙ্খলা ফিরেছে, আমরা চাই সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিতে আমরা প্রস্তুত এবং ঐক্যবদ্ধ।
ডোর টু ডোর কার্যক্রমে নারীদের সম্পৃক্ত করা ছাড়াও, নারী নেতৃত্ব এবং নারীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের দিকে নজর দিচ্ছে বিএনপি। দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নারীদের সম্পৃক্ততা দলকে শুধু সহানুভূতি নয়, ভোটের ক্ষেত্রেও বাড়তি সুবিধা এনে দিতে পারে।
একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন- আমরা চাই নারীরা বুঝুক, এই রাষ্ট্র সংস্কারের লড়াইতে তাদের সরাসরি অংশগ্রহণ জরুরি। নারীদের অংশগ্রহণ আমাদের আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি আরও মজবুত করবে।
বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন প্রসঙ্গেও আলোচনা হয়। নেতারা মনে করেন, যেসব সংস্কার সংবিধান সংশোধনের বাইরের, সেগুলো নির্বাহী আদেশ বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন এমন প্রস্তাবনাগুলো আগামী সংসদে উত্থাপন করা হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এসব সংস্কার কার্যক্রমকে আইনি ভিত্তি দিতে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি এখন এক ধরনের "নির্বাচনি পুনরুদ্ধার কৌশল" অনুসরণ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “বিএনপি এখন মাঠে সক্রিয় থেকে রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে চাইছে। তবে এক্ষেত্রে সব দলকে নিয়ে ঐক্যমুখী থাকার কৌশলটাই হবে সবচেয়ে কার্যকর।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন- ইসলামী দলগুলোর কর্মসূচি চাপ তৈরির কৌশল হলেও বিএনপি যদি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে পারে, তবেই তারা নির্বাচনি রাজনীতিতে ইতিবাচক ফল পাবে।
বিএনপির এই ‘ডোর টু ডোর’ কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে দলটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শৃঙ্খলা ও জনসম্পৃক্ততায় জোর দিলে, দলটি আসন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হতে পারে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—রাজনৈতিক মাঠে শুধু পরিকল্পনা নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত পার্থক্য গড়ে দেবে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আমেনা খাতুন ইভা
All rights reserved ©2017dailyaparadhchakra.com