সাল ১৮৮৮। ফ্রান্সের একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলো একটি চমকে দেওয়ার মতো খবর—
“Le marchand de la mort est mort”—অর্থাৎ, “মৃত্যুর কারবারি মারা গেছেন।”
খবরে বলা হলো, মানুষের হত্যাকে ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুততর করার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া ড. আলফ্রেড নোবেল মারা গেছেন।
কিন্তু সংবাদটি ছিল ভুল।
মৃত্যু হয়েছিল তাঁর ভাইয়ের। ভুলবশত সংবাদপত্রে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
আর সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়—পত্রিকার সেই সংবাদটি পড়ছিলেন আলফ্রেড নোবেল নিজেই।
ভুল সংবাদ হলেও সেটি তাঁর মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তিনি যেন প্রথমবার নিজের মৃত্যুর পরের পৃথিবীকে দেখতে পেলেন।
মানুষ তাঁকে কীভাবে স্মরণ করবে?
অস্ত্র ও বিস্ফোরক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ অর্জনকারী একজন ধনী ব্যক্তি হিসেবে? নাকি মানবকল্যাণে কিছু রেখে যাওয়া একজন মানুষ হিসেবে?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে বড় পরিবর্তনের প্রেরণা হয়ে ওঠে।
১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে প্যারিসের সুইডিশ-নরওয়েজিয়ান ক্লাবে আলফ্রেড নোবেল তাঁর শেষ উইলে স্বাক্ষর করেন। তাঁর বিপুল সম্পদের বড় অংশ রেখে যান এমন একটি পুরস্কার প্রতিষ্ঠার জন্য, যা পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়।
আজও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় বিজ্ঞান, সাহিত্য, শান্তি ও মানবকল্যাণের সঙ্গে।
[caption id="attachment_19712" align="alignnone" width="543"] নোবেল তার সম্পদ একটি ফাউন্ডেশনে দান করেন যা নোবেল পুরস্কারের জন্য তহবিল সরবরাহ করে[/caption]
কয়েক দিন আগে এক বিপুল বিত্তের অধিকারী পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিল।
তাঁকে বললাম—
“আপনার প্রভু আপনাকে কম দেননি, মাশাআল্লাহ। সবকিছু শুধু সন্তানদের জন্য রেখে যাচ্ছেন। নিজের জন্য কিছু করছেন না কেন?”
তিনি জানতে চাইলেন—
“নিজের জন্য বলতে কী বোঝাচ্ছেন?”
আমি বললাম—
“আপনি আজ মারা গেলে এই সম্পদ আর আপনার থাকবে না।”
তিনি হেসে বললেন—
“এভাবে ভাবলে তো সম্পদ বানানো যায় না।”
কথাটি সত্য। সম্পদ অর্জনের জন্য মানুষকে ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই হয়। সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও একজন অভিভাবকের স্বাভাবিক দায়িত্ব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে আমরা কি নিজের পরকালের ভবিষ্যৎ ভুলে যাচ্ছি?
ইসলামি শিক্ষায় বহুল উদ্ধৃত একটি হাদিসে বলা হয়েছে—
“মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল ছাড়া—সাদাকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।”
এই তিনটি বিষয় আমাদের জীবনের সম্পদ ও উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
১. সাদাকায়ে জারিয়া
এমন দান বা কল্যাণমূলক কাজ, যার উপকার মানুষ দীর্ঘদিন পেতে থাকে।
২. উপকারী জ্ঞান
মানুষকে শেখানো এমন জ্ঞান, যার মাধ্যমে অন্যরা উপকৃত হয়।
৩. নেক সন্তান
যে সন্তান বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে এবং তাদের রেখে যাওয়া ভালো কাজকে এগিয়ে নেয়।
[caption id="attachment_19714" align="alignleft" width="571"] ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে প্যারিসের সুইডিশ-নরওয়েজিয়ান ক্লাবে আলফ্রেড নোবেল তাঁর শেষ উইলে স্বাক্ষর করেন। তাঁর বিপুল সম্পদের বড় অংশ রেখে যান এমন একটি পুরস্কার প্রতিষ্ঠার জন্য, যা পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়।[/caption]
আমি সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলাম—
“আজ আপনি কি আপনার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করেছেন?”
তিনি বললেন, “না।”
“গতকাল?”
“না।”
“গত সপ্তাহে?”
তিনি বললেন, “হ্যাঁ, করেছি।”
তখন প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে উঠল—
আমরা নিজের বাবা-মায়ের জন্য নিয়মিত দোয়া করতে না পারলেও কেন ধরে নিই, আমাদের সন্তানরা মৃত্যুর পর আমাদের জন্য নিয়মিত দোয়া করবে?
সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব। ধর্ম, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ শেখানোও জরুরি।
কিন্তু শুধু সম্পদ রেখে গেলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়?
আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ চলে যায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।
এক সন্তানের জন্য বাড়ি।
আরেক সন্তানের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট।
ব্যাংকে টাকা।
ব্যবসায় বিনিয়োগ।
তারপর সেই সম্পদ রক্ষার জন্য আরও সম্পদ।
একটি বাড়ি হয়ে গেলে মনে হয়—আরেকটি বাড়ি থাকলে ভালো হতো।
একটি ব্যাংক ব্যালেন্স হলে মনে হয়—আরও কিছু সঞ্চয় করা দরকার।
এভাবেই চলতে থাকে জীবন।
কিন্তু একসময় হঠাৎ জীবনের সবচেয়ে অনিবার্য অতিথি এসে দাঁড়ায় সামনে—
মৃত্যু।
তখন আর বাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসা কিংবা জমিজমা সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
থেকে যায় শুধু কর্মের হিসাব।
আমি আমার সন্তানদের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?
আর নিজে চলে যাওয়ার পর মানুষের জন্য কী রেখে যাচ্ছি?
আমার সম্পদ কি শুধু আমার পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
নাকি আমার কোনো ভালো কাজ মৃত্যুর পরও মানুষের উপকার করবে?
একটি স্কুল, একটি লাইব্রেরি, একটি পানির ব্যবস্থা, একজন অসহায় মানুষের চিকিৎসা, একটি শিক্ষামূলক উদ্যোগ, উপকারী কোনো জ্ঞান—এসবও হতে পারে মানুষের জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার।
সম্পদ সন্তানদের জন্য রাখা দায়িত্ব হতে পারে; কিন্তু মানবকল্যাণে কিছু রেখে যাওয়া হতে পারে মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার এক পথ।
আলফ্রেড নোবেলের জীবন থেকে তাই একটি বিষয় অন্তত ভাবা যায়—
মানুষ একদিন মারা যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কাজ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে পারে।
মৃত্যু কখন আসবে, আমরা কেউ জানি না।
তাই প্রশ্নটা সম্পদের পরিমাণ নিয়ে নয়।
প্রশ্নটা হলো—
—আজিজুল করিম পেয়ারু
সংগৃহীত ও সম্পাদিত
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com