বাংলাদেশ সাঁতার অঙ্গনে ফের এক লজ্জাজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে রাজশাহীর আলমগীর সুইমিং ক্লাবের কোচ আলমগীর হোসেন। এক নারী সাঁতারুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশন। পাশাপাশি ক্লাব থেকেও তাঁকে বহিষ্কারের জন্য রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে চিঠি দিচ্ছে ফেডারেশন।
ফেডারেশনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যদিও ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শাহীন জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন ফেডারেশনের সভাপতি।
ঘটনার সূত্রপাত মে মাসে, যখন একটি বয়সভিত্তিক সাঁতার প্রতিযোগিতার সময় কোচ আলমগীর হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তিনি সাঁতারু সাধনা আক্তার সুইটিকে বডি ম্যাসেজের প্রলোভন দেখিয়ে অশালীন আচরণ করেন এবং মোবাইল ফোনে অশ্লীল ভিডিও ও যৌন উদ্দীপক বার্তা পাঠান। এসব ঘটনা তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের কমিটি ১০ আগস্ট তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কোচের আচরণ ছিল "অতিশয় বিকৃত মানসিকতার পরিচায়ক", যা কোনোভাবেই প্রশিক্ষকের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তবে প্রতিবেদন আরও জানায়, ভুক্তভোগী সাঁতারুও কিছু আচরণে অসতর্ক ছিলেন, যা অভিযুক্তকে উৎসাহিত করতে পারে। এ প্রসঙ্গে তদন্তকারীরা নারী সাঁতারুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি দলে অন্তত একজন নারী কোচ বা ম্যানেজার রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর আগেও ক্রীড়াঙ্গনে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। ২০০৯ সালে কুষ্টিয়ার সাঁতারু আরিফা খাতুন মাত্র ১৫ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। সতীর্থদের দাবি, তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলেন এবং এর পেছনে এক কোচের ভূমিকা ছিল। প্রমাণের ভিত্তিতে সেই কোচকে পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করা হয়।
জুজুৎসু অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম নিউটনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ভয়াবহ অভিযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণের সুযোগ ও বিদেশ ভ্রমণের প্রলোভন দেখিয়ে তিনি একাধিক নারী প্রশিক্ষণার্থীকে ধর্ষণ করেন। এমনকি ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। র্যাবের হাতে গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান এবং ধর্ষিত এক তরুণীকে বিয়েও করেন।
এছাড়াও ভারোত্তোলন, ব্যাডমিন্টন, শুটিং সহ নানা খেলাধুলার অঙ্গনে নারী খেলোয়াড়রা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ২০০৬ সালের মেলবোর্ন কমনওয়েলথ গেমসেও বাংলাদেশের এক শুটার বিদেশি ভলেন্টিয়ারকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে গ্রেফতার হন।
বারবার এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেও সঠিক প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ক্রীড়াঙ্গনে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
নারী খেলোয়াড়দের জন্য পৃথক অভিযোগ গ্রহণ ও সহায়তা সেল, নারী কোচের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা, খেলোয়াড়-প্রশিক্ষকের আচরণ বিধিমালা তৈরি এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই ঘৃণ্য চক্র থামবে না বলেই মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com