বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে—গ্রামে আয় কম, শহরে সুযোগ বেশি। ফলে জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শহর ও বিশেষ করে রাজধানীমুখী হচ্ছেন। কেউ চাকরির আশায়, কেউ ব্যবসার জন্য, কেউ দিনমজুরি কিংবা বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত হতে শহরে এসে ভিড় করছেন।
এ বাস্তবতার পরিবর্তন প্রয়োজন।
গ্রামের মানুষকে যদি নিজের এলাকায় থেকেই ভালো আয়, কর্মসংস্থান, ব্যবসার সুযোগ ও নিরাপদ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া যায়, তাহলে জীবিকার জন্য বাধ্য হয়ে শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কেন শহরমুখী মানুষের স্রোত?
গ্রামে অনেক মানুষের জমি আছে, শ্রম আছে, দক্ষতা আছে—কিন্তু বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। অন্যদিকে শহরে রয়েছে তুলনামূলক বেশি চাকরি, ব্যবসা, শিল্পকারখানা, পরিবহন, নির্মাণ ও সেবা খাতের সুযোগ।
ফলে একজন তরুণ যখন নিজের এলাকায় কাঙ্ক্ষিত কাজ খুঁজে পান না, তখন তার সামনে সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়—শহরে চলে আসা।
এই প্রবণতা শুধু শহরের ওপর চাপ বাড়ায় না; গ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও দুর্বল করে।
গ্রামেই তৈরি হতে পারে নতুন অর্থনীতির কেন্দ্র
গ্রামের অর্থনীতি শুধু কৃষিনির্ভর থাকবে—এ ধারণা বদলাতে হবে। কৃষির পাশাপাশি গ্রামেই গড়ে তুলতে হবে—
- কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিং শিল্প;
- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প;
- নারী ও যুব উদ্যোক্তা কার্যক্রম;
- আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণকেন্দ্র;
- কারিগরি ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান;
- অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা ও ই-কমার্স;
- গার্মেন্টস ও হস্তশিল্পের ক্ষুদ্র ইউনিট;
- মাছ, দুধ, মাংস ও কৃষিপণ্যের আধুনিক বাজারব্যবস্থা;
- স্থানীয় পর্যায়ে গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ ও পরিবহন সুবিধা।
গ্রামে উৎপাদন হবে, গ্রামেই প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ হবে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সেই পণ্য পৌঁছে যাবে দেশের বড় বাজার ও বিদেশের বাজারে—এমন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
শহরে গেলেই আয়”—এই মানসিকতা বদলাতে হবে
উন্নয়নের অর্থ যদি শুধু রাজধানী ও বড় শহরে কর্মসংস্থান তৈরি করা হয়, তাহলে একদিকে শহরের জনসংখ্যা ও যানজট বাড়বে, অন্যদিকে গ্রাম থেকে কর্মক্ষম মানুষ বেরিয়ে যাবে।
তাই প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ।
দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, বাজারব্যবস্থা এবং উদ্যোক্তা সহায়তা তৈরি করা গেলে একজন মানুষকে জীবিকার জন্য নিজের বাড়ি ছাড়তে হবে না।
কৃষক শুধু উৎপাদক নয়, উদ্যোক্তাও
কৃষক ধান, সবজি, ফল বা মাছ উৎপাদন করবেন—কিন্তু লাভের বড় অংশ যদি মধ্যস্বত্বভোগী নিয়ে যায়, তাহলে উৎপাদক পর্যায়ে আয় বাড়বে না।
কৃষকের সঙ্গে সরাসরি বাজারের সংযোগ, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ন্যায্যমূল্য, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হবে।
গ্রামের কৃষিপণ্য যদি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পণ্য হয়ে ওঠে, তাহলে ডলার উপার্জনের জন্য মানুষকে শুধু শহরমুখী হওয়ার প্রয়োজন হবে না।
ডলার আয়ের সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে গ্রামে
ডিজিটাল বাংলাদেশের পরবর্তী ধাপে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে—গ্রাম থেকেই বৈদেশিক আয়।
একজন তরুণ যদি নিজের ইউনিয়ন বা উপজেলা থেকে বসে সফটওয়্যার, ডিজিটাল সেবা, ডিজাইন, অনলাইন মার্কেটিং বা অন্যান্য বৈধ সেবা বিদেশে বিক্রি করতে পারেন, তাহলে কর্মসংস্থানের জন্য তাকে ঢাকায় আসতে হবে না।
অর্থাৎ—
**“গ্রাম থেকে শহরে মানুষ যাবে” নয়;
“গ্রাম থেকেই কাজ যাবে শহর ও বিদেশের বাজারে”—এই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।**
দৈনিক অপরাধচক্রের মতামত
শহরের উন্নয়ন প্রয়োজন, কিন্তু শহরকে দেশের সব অর্থনৈতিক সুযোগের একমাত্র কেন্দ্র বানানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি হতে হবে গ্রাম, উপজেলা, জেলা ও শহর—সবকেন্দ্রিক।
মানুষ যেখানে জন্মগ্রহণ করে, সেখানেই যদি শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও প্রযুক্তির সুযোগ পায়, তাহলে রাজধানীমুখী অতিরিক্ত জনস্রোত কমবে। কমবে বস্তি, যানজট, আবাসন সংকট ও নগরজীবনের নানা চাপ।
পরিবর্তনের সময় এখনই।
গ্রামকে শুধু ভোটের সময় মনে রাখলে হবে না—গ্রামকে অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তিতে পরিণত করতে হবে।
দৈনিক অপরাধচক্র
“অপরাধীর মুখোশ উন্মোচনের সম্মিলিত বিবেকের নিরপেক্ষ প্রকাশ”
প্রকাশক ও সম্পাদক:- আমিনা খাতুন ইভা
নির্বাহী সম্পাদক: জাহাঙ্গীর আলম ভিপি
All rights reserved ©2026 dailyaparadhchakra.com