ভারতের জনপ্রিয় অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা নানা পাটেকার ৭৫ বছর বয়সে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) মারা গেছেন। গত ৮ অক্টোবর ভারতের গোয়ায় নিজ বাসভবনে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
তবে নানা পাটেকারকে মানুষ শুধু তাঁর অভিনয়ের জন্যই স্মরণ করবেন না; অসহায় কৃষক পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্যও তিনি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
গাড়ি কেনার টাকা দিয়ে অসহায় পরিবারের পাশে
প্রায় এক দশক আগে ভারতের মহারাষ্ট্রে কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা নানা পাটেকারকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। টেলিভিশনে আত্মহত্যা করা এক কৃষকের পরিবারের সাক্ষাৎকার দেখতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি পরিবারগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় জীবিকা ও খাবারের ব্যবস্থা।
নিজের গাড়ি কেনার জন্য জমানো বিপুল অর্থ দিয়ে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধু মকরন্দ আনাসপুরের সহযোগিতায় কৃষক পরিবারের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি।
প্রথম দিকে নিজের সাহায্যের কথা প্রকাশ্যে আনতে আগ্রহী ছিলেন না নানা। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, বিচ্ছিন্নভাবে কিছু অর্থ বিতরণ করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত সহায়তা।
সেখান থেকেই ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর যাত্রা
কৃষকদের দুর্দশা ও তাঁদের পরিবারের সংকট মোকাবিলায় নানা পাটেকার এবং মকরন্দ আনাসপুরে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটি কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সহায়তা এবং পানিসংরক্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে কাজ করে আসছে।
এই উদ্যোগের পেছনে ছিল একটি সহজ উপলব্ধি—মানুষের দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করলেই চলে না, প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ।
নানা পাটেকারের মানবিক উদ্যোগে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও ছিল অনুপ্রেরণাদায়ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর এই মানবিকতার গল্পে এক বৃদ্ধার ১০০ টাকা দিয়ে সহায়তা করার ঘটনাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। তবে এ ধরনের ব্যক্তিগত ঘটনার বিবরণ প্রকাশের আগে মূল সাক্ষাৎকার বা নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
মানুষের জন্য কাজই হোক জীবনের সার্থকতা
নানা পাটেকারের জীবন ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয় না। সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা, দায়িত্ববোধ এবং আন্তরিকতাও বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে।
একজন শিল্পীর প্রকৃত সার্থকতা কেবল তাঁর জনপ্রিয়তা কিংবা অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের দুঃসময়ে তাঁর ভূমিকা ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও তাঁকে স্মরণীয় করে রাখে।
নানা পাটেকারের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি তাঁর মানবিক উদ্যোগও মানুষের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। তাঁর প্রয়াণে চলচ্চিত্র অঙ্গন হারাল একজন বিশিষ্ট শিল্পী, আর সমাজ হারালেন এমন একজন মানুষকে, যিনি নিজের সামর্থ্যকে অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন।





