ঢাকা, মঙ্গলবার: তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডস। একই সঙ্গে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী, কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদারের আগ্রহ জানিয়েছে দেশটি।
মঙ্গলবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাতে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বৈঠকের বিষয়গুলো সাংবাদিকদের জানান।
তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য সহযোগিতা
বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও কারিগরি সহায়তার বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের আগ্রহকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নদী উন্নয়নে নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস উভয়ই বদ্বীপ রাষ্ট্র। তাই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন মোকাবিলা, ভূমি পুনরুদ্ধার ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
এ সময় ভূমি পুনরুদ্ধারে নেদারল্যান্ডসের অর্জিত অভিজ্ঞতার বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
নদী ব্যবস্থাপনা ও ভূমি পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা
নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, ভূমি পুনরুদ্ধার, চর উন্নয়ন এবং অভিযোজনক্ষম নদীব্যবস্থাপনায় দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের সম্পর্ক আরও জোরদার করার উপযুক্ত সময় এসেছে। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আলোচনা
বৈঠকে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতা কামনা করে বাংলাদেশ।
মুক্ত বাণিজ্যের বিষয়ে নিজের আগ্রহের কথা জানান নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কৃষিতে সহযোগিতা
বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চান নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক পরিকল্পনার প্রশংসা করেন তিনি।
কৃষি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। কৃষি প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নেদারল্যান্ডসের প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে, সংকটটির মূল উৎস মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধানও সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
এ সংকট সমাধানে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়েও আলোচনা
বাংলাদেশের গণতন্ত্র সুসংহত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর সরকার দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও সুসংহত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নেদারল্যান্ডস সফরের আমন্ত্রণ জানান দেশটির মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা।
উপস্থিত ছিলেন যারা
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইওরিস ভ্যান বোমেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তিস্তা প্রকল্পে সম্ভাব্য কারিগরি সহায়তার আগ্রহ প্রকাশের পাশাপাশি বাণিজ্য, কৃষি, জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার নতুন সম্ভাবনা তুলে ধরেছে। তবে তিস্তা প্রকল্পে সহায়তার ধরন ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে ভবিষ্যৎ আলোচনা ও কারিগরি মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হবে।







