লোভনীয় চাকরির প্রলোভনে ফাঁদে ফেলে বাংলাদেশ থেকে চীনে পাচার হচ্ছে অসংখ্য তরুণী। এই অমানবিক চক্রের শিকার হয়ে অনেকে বন্দিদশায় কাটাচ্ছেন দিন, যখন কেউ কেউ কৌশলে দেশে ফিরে এসে উন্মোচন করছেন এই অন্ধকার জালের রহস্য।
সম্প্রতি এক তরুণীর মোবাইল ফোনে বাঁচার আকুতি এবং আরেকজনের ফিরে আসার গল্প থেকে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা প্রমাণ করে যে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে এই অপরাধ। পুলিশের অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৪ বছরে কয়েকশ তরুণী এই চক্রের শিকার হয়েছেন, এবং তাদের অনেকেই এখনো চীনের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে আছেন।
এই ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে দুই তরুণী- নীলা (ছদ্মনাম) এবং হেলেনা (ছদ্মনাম)। নীলা এখনো চীনের বন্দিদশায় আটকে আছেন, যেখান থেকে তিনি মোবাইল ফোনে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, হেলেনা সম্প্রতি কৌশলে দেশে ফিরে এসেছেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতা শুনে হতবাক হয়ে যাওয়ার মতো। হেলেনা বলেন, “আমাকে এবং আমার এক বান্ধবীকে চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে চীনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর পর আমরা বুঝতে পারি যে এটি একটি পাচার চক্রের ফাঁদ। আমি দেশে ফিরে এসেছি, কিন্তু আমার বান্ধবী এখনো সেখানে আটকে আছে। পাচারকারীরা এখন আমাকেই তাদের চক্রের অংশ বানাতে চাইছে, যাতে আমার মাধ্যমে আরও মেয়েদের পাঠানো যায়। কিন্তু আমি চাই না যে অন্য কোনো তরুণী এই নরকযাত্রায় পড়ুক।”
এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন আব্বাস মোল্লা নামের এক ব্যক্তি, যাঁর প্রধান সহযোগী সিলভী নামের এক নারী। অন্য সদস্যদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাহিদুল ইসলাম ওরফে বাবু এবং আকাশ। এই গ্রুপটি মূলত অসহায় দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী তরুণীদের টার্গেট করে। তারা পাসপোর্ট, ভিসা এবং ইমিগ্রেশনের সবকিছু নিজেরাই সামলায়, যাতে শিকাররা কোনো সন্দেহ না করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই চক্রের জাল বিস্তারিত, এবং তারা তরুণীদের পছন্দের কাজের অফার দিয়ে মোটা বেতনের লোভ দেখায়। চীনে পৌঁছানোর পর এই তরুণীদের বিক্রি করা হয়, প্রত্যেককে প্রায় ৫০ লাখ টাকায়। এই অর্থের একটি বড় অংশ চক্রের সদস্যদের পকেটে যায়, যখন শিকাররা যৌন নির্যাতন এবং দাসত্বের শিকার হন।
পুলিশ এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে এই চক্রটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সংযোগপূর্ণ। একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, টার্গেট তরুণীদের পাসপোর্ট তৈরি করা হয় মাত্র চার ঘণ্টায়। সাধারণত পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন, কিন্তু এই চক্রের সদস্যরা সেটা ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করে। তারা ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে, যা তাদের কাজকে সহজ করে। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা দিনের মধ্যেই সফল হয়, যখন সাধারণ মানুষকে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। ইমিগ্রেশনে তো কোনো প্রশ্নই করা হয় না—যেন সবকিছু আগে থেকেই ম্যানেজ করা। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন যে পাচারকারীরা পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ভিসা সেন্টার এবং ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ করে। এই সিন্ডিকেটের কারণে অনেক তরুণী দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর আর ফিরে আসতে পারেন না।
এই সমস্যার মূল কারণ চীনের জেন্ডার অসমতুল্যতা। চীনের এক সন্তান নীতির ফলে পুরুষের সংখ্যা নারীর চেয়ে অনেক বেশি, প্রায় ৩৪.৯ মিলিয়ন অতিরিক্ত পুরুষ। এর ফলে অনেক চীনা পুরুষ বিদেশী নারীদের বিয়ে করতে চান, কিন্তু এর পিছনে লুকিয়ে আছে পাচারের ছায়া। বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, নেপাল, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম থেকে নারীদের পাচার করা হয় চীনে, যেখানে তাদের বিয়ের নামে বিক্রি করা হয় অথবা যৌনকর্মে বাধ্য করা হয়। চীনা দূতাবাস সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি সতর্কবার্তা জারি করেছে, যাতে বলা হয়েছে যে ক্রস-বর্ডার ম্যারেজ স্ক্যাম এবং অনলাইন ডেটিংয়ের নামে পাচার হচ্ছে। তারা চীনা নাগরিকদের সতর্ক করে বলেছে যে ‘বাইং ব্রাইড’ বা বিদেশী স্ত্রী কেনার ধারণা থেকে দূরে থাকতে, কারণ এতে হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের অভিযোগ উঠতে পারে।
বাংলাদেশে এই চক্রের শিকাররা মূলত দরিদ্র এবং অশিক্ষিত পরিবার থেকে আসেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সামাজিক শ্রেণী, দারিদ্র্য, নারী ক্ষমতায়নের অভাব এবং শিক্ষার কমতি এই পাচারকে উস্কে দেয়। অনেক তরুণী চাকরির লোভে ফাঁদে পড়েন, কারণ দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। পাচারের পর তারা চীনে পৌঁছে বুঝতে পারেন যে তাদের বিক্রি করা হয়েছে। কেউ কেউ যৌন নির্যাতনের শিকার হন, কেউ বাড়ির কাজে দাসত্ব করেন। একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে চীনে পাচার হওয়া নারীদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে, এবং অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের নামে এই পাচার চলছে।
ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরে আসার পরও সমস্যা শেষ হয় না। অনেকে মামলা করতে গিয়ে উল্টো বিপাকে পড়েন, কারণ চক্রের সদস্যরা তাদের হুমকি দেয় অথবা তাদেরকেই অপরাধী বানানোর চেষ্টা করে। সম্প্রতি শাহ আলী থানায় এই চক্রের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহ সুলতান মাহমুদ বলেন, “আমরা চক্রের সদস্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। প্রযুক্তিগত সহায়তায় তাদের ধরার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্যান্য ইউনিটও এতে জড়িত। আশা করছি শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা যাবে।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার সরকারী স্তরে কঠোর পদক্ষেপ। পাসপোর্ট এবং ভিসা প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা আনা দরকার, যাতে ভুয়া ডকুমেন্ট ব্যবহার রোধ করা যায়। সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো উচিত দরিদ্র এলাকায়, যাতে তরুণীরা চাকরির লোভে ফাঁদে না পড়েন। চীনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করে পাচার রোধ করা যেতে পারে। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তা প্রদানও জরুরি। অন্যথায় এই অন্ধকার চক্র আরও অনেক জীবন নষ্ট করবে।