১৯৭১ সালে, যুদ্ধের ময়দানে এক তরুণী ছিল—তার নাম ইতিহাস জানে না, জানে শুধু “বীরাঙ্গনা” শব্দটা। সে হারিয়েছিল নিজের ঘর, শরীর, মান-সম্মান—কিন্তু হারায়নি মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা। বাঙালির স্বাধীনতার পতাকায় তার রক্ত ছিল, তার চোখের জল ছিল, তার আত্মত্যাগের শপথ ছিল। রাষ্ট্র তাকে পরে স্বীকৃতি দিয়েছে—“বীরাঙ্গনা” উপাধি দিয়ে।
কিন্তু কি সে ফিরে পেয়েছিল সমাজের চোখে নিজের সম্মান? না। তার সন্তানদের বলা হতো—”ওদের মা যুদ্ধের সময়…”
এই অসমাপ্ত বাক্যটাই তার সারাজীবনের বিচার হয়ে গিয়েছিল।
অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেল স্বাধীনতার।
এখনকার বাংলাদেশ—স্বাধীন, সার্বভৌম, উন্নয়নশীল, প্রযুক্তিতে অগ্রগামী।
কিন্তু এক তরুণী—বয়স বিশ-একুশ—নিজের ধর্ষণের বিচার না পেয়ে গলায় দড়ি দিলো।
তার নামও ইতিহাস জানবে না।
কারণ তার মামলার ফাইল হারিয়ে যাবে আদালতের ধুলায়, তার পরিবারকে বলা হবে—”ধৈর্য ধরুন, তদন্ত চলছে”।
আর অভিযুক্তরা ঘুরবে শহরের আলোয়—গর্বিত, বেপরোয়া, অক্ষত।
পরাধীন দেশে ধর্ষিতা নারী ছিল যুদ্ধের শিকার,
স্বাধীন দেশে ধর্ষিতা নারী হলো রাষ্ট্রের উদাসীনতার শিকার।
একজন লড়েছিল মুক্তির জন্য,
আরেকজন লড়তে লড়তে মুক্তি খুঁজে পেল মৃত্যুতে!
এই দুই নারীর কাহিনি এক সূত্রে বাঁধা—বিচারের অনুপস্থিতিতে।
বীরাঙ্গনা ন্যায়বিচার পায়নি সমাজে,
স্বাধীন দেশের ধর্ষিতা পায়নি আদালতে।
আইনের ধারা, তদন্তের জটিলতা, সাক্ষ্য প্রমাণের ঘাটতি—
সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে “বিচারহীনতার এক অভিশপ্ত ইতিহাস।”
বাংলাদেশের সংবিধান বলে—
“সকল নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে।”
কিন্তু বাস্তবতা বলে—
“বিচার হয় ক্ষমতাবানদের সুবিধামতো।”
একজন পুলিশ অফিসার যদি নীরব থাকে,
একজন আইনজীবী যদি সময় নেন,
একজন বিচারক যদি রাজনৈতিক চাপে পড়ে যায়
তবে ধর্ষণের রায় যতদিনে আসে, ভুক্তভোগীর জীবন ততদিনে নিভে যায়।
রাষ্ট্র গর্ব করে বীরাঙ্গনাদের নিয়ে স্মৃতিচারণায়,
কিন্তু স্বাধীন দেশের মেয়েরা এখনো ভয় পায় থানায় যেতে।
তাদের ভয়—নাম প্রকাশ হবে, লজ্জা জুটবে, বিচার হবে না।
তারা জানে—এই রাষ্ট্রে ধর্ষণের শিকারই আসামির মতো জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়।
এ যেন দুই সময়ের একই গল্প—
শুধু পরাধীনতার রঙ বদলেছে, অন্যায়ের রূপ বদলায়নি।
একজন বিদেশি সৈন্যের হাতে লাঞ্ছিত,
আরেকজন নিজের দেশের নাগরিকের হাতে নিঃশেষ।
দু’জনের কান্নাই একই—ন্যায়বিচারের জন্য।
বাংলাদেশ আজ ৫০ বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র।
কিন্তু নারী এখনো স্বাধীন নয় নিজের নিরাপত্তায়, নিজের মর্যাদায়, নিজের ন্যায়ে।
রাষ্ট্রের চোখে তাদের পরিচয় বদলালেও ভাগ্য বদলায়নি।
“একজন বীরাঙ্গনা ছিলেন ইতিহাসের শিকার,
আরেকজন ধর্ষিতা হলো ন্যায়ের অভাবের প্রতীক।
দুজনেই প্রমাণ করে গেলেন—
যেখানে বিচার থেমে যায়,
সেখানেই “স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ” থেকে যায়।”
আর অপরাধ বাড়তেই থাকে অন্যের দেখানো পথে
অনুপ্রাণিত হয়ে!