নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) প্রতিরোধে কার্যকর আইনি সুরক্ষার দাবি জানিয়েছে মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ম্যাফ)। একই সঙ্গে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ TFGBV-এর সুস্পষ্ট সংজ্ঞা ও প্রতিকারের বিধান অন্তর্ভুক্ত করে আইনটি সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যাফের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত ছয় দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
‘TFGBV-কে স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে’
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাকে একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ TFGBV এবং ‘সম্মতি’র সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নেই।
এ ছাড়া ডিপফেক, সেক্সটরশন, সাইবারফ্ল্যাশিং, সাইবারস্টকিং, ডক্সিং এবং দলবদ্ধ অনলাইন হয়রানির মতো নতুন ধরনের ডিজিটাল সহিংসতা প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট বিধানের ঘাটতি রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন বক্তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ছয় দফা সুপারিশ
ম্যাফের পক্ষ থেকে TFGBV প্রতিরোধে ছয় দফা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
১. TFGBV ও ‘সম্মতি’র সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ।
২. নতুন ধরনের ডিজিটাল সহিংসতা মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট বিধান সংযোজন।
৩. নিরাপদ ও সহজলভ্য অভিযোগ ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীর পরিচয়ের গোপনীয়তা নিশ্চিত করা।
৪. ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা করা।
৫. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৬. ক্ষতিপূরণসহ দ্রুত ও কার্যকর আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা করা।
যারা বক্তব্য দেন
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ TFGBV অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন ও সুলতানা জেসমিন জুঁই।
এ সময় ম্যাফের সহসভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইদুর রহমান মিন্টু, ম্যাফ সদস্য ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক শাহীনূর নারগিসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সায়রা চন্দ্র চাকমা ও বাংলাদেশ যুব ফেডারেশনের যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এনসিপির ইনজামুল হক ও ছাত্রদলের নাসরিন রহমান পপি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন ম্যাফের সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন লাবু, প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন সেক্রেটারি আরাফাত বিল্লাহ খান, সহকারী গবেষণা সম্পাদক হাওয়া আক্তার তোহা, সদস্য আরমানুল হক, মোহাম্মদ আলী তোহা ও মৌসুমী শেখসহ অন্যরা।
‘TFGBV শুধু সাইবার অপরাধ নয়’
বক্তারা বলেন, TFGBV কেবল একটি সাইবার অপরাধ নয়; এটি মানবাধিকার, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণের পথে বড় বাধা। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে হয়রানি ও সহিংসতার ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বিদ্যমান আইনি কাঠামোকে সময়োপযোগী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
তারা বলেন, ভুক্তভোগীরা অনেক সময় সামাজিক অপমান, পরিচয় প্রকাশ, ভয়ভীতি ও প্রতিশোধের আশঙ্কায় অভিযোগ করতে চান না। তাই অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দ্রুত প্রতিকার—প্রতিটি পর্যায়ে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান
ম্যাফের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত ছয় দফা সুপারিশ বিবেচনায় নিয়ে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-কে আরও কার্যকর, ভুক্তভোগীবান্ধব ও সময়োপযোগী করার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলা এবং TFGBV সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের সক্রিয় সহযোগিতা কামনা করেন বক্তারা।
মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে গঠিত একটি বহুদলীয় প্ল্যাটফর্ম। সংবাদ সম্মেলনটি ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বাস্তবায়নাধীন এবং যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (FCDO) অর্থায়নে পরিচালিত B-SPACE প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়।







