ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা এখন আর কেবল অবকাঠামোগত সংকট নয়—এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, দুর্বল বাস্তবায়ন এবং প্রশ্নবিদ্ধ প্রকল্প ব্যয়ের এক জটিল চিত্র। বিশেষ করে ঢাকা-৭ আসনে প্রতি বছর বর্ষা এলেই নগরবাসীর সামনে একই দুর্ভোগ—হাঁটুসমান পানি, অচল সড়ক, বন্ধ ব্যবসা, বিপর্যস্ত জনজীবন।
অথচ বাস্তবতা হলো, গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে শত শত কোটি টাকার একাধিক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ড্রেন সংস্কার, খাল পুনঃখনন, পাম্প স্থাপনসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক প্রকল্পেই ব্যয়ের তুলনায় কাজের মান ছিল নিম্নমানের, কোথাও কাজ অসম্পূর্ণ, আবার কোথাও স্বল্প সময়ের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে একই এলাকায় বারবার সংস্কারের নামে নতুন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতা খুব কমই দৃশ্যমান হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন। সেখানে উন্নত চীনা প্রযুক্তির মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসনের নতুন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়।
চীনা প্রতিনিধিরা স্মার্ট ড্রেনেজ সিস্টেম, দ্রুত পানি নিষ্কাশন প্রযুক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে—এই নতুন পরিকল্পনা কি সত্যিই টেকসই সমাধান আনবে, নাকি এটি হবে আরেকটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, যার ফলাফল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, পূর্ববর্তী কাজগুলোর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতার স্পষ্ট কাঠামো। কারণ, শুধুমাত্র নতুন প্রযুক্তি বা বিদেশি সহযোগিতা এনে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, যদি পুরনো অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি থেকেই যায়।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, পুরান ঢাকার সংকীর্ণ সড়ক, দখল হয়ে যাওয়া খাল-নালা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। এগুলো সমাধান ছাড়া বড় বাজেটের প্রকল্পও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
নগরবাসীর ক্ষোভও স্পষ্ট—“প্রতি বছরই শুনি নতুন প্রকল্প, নতুন প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পানি কমে না, বরং দুর্ভোগ বাড়ে।”
এখন প্রশ্ন একটাই—ঢাকা-৭ এর জলাবদ্ধতা কি সত্যিই সমাধানের পথে, নাকি এটি আবারও নতুন বাজেট, নতুন প্রকল্প এবং পুরনো অনিশ্চয়তার এক পুনরাবৃত্তি?
রাজধানীবাসী অপেক্ষায়—প্রতিশ্রুতির নয়, কার্যকর ও দৃশ্যমান পরিবর্তনের।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সিরিজ (বিস্তারিত সংস্করণ)
“ঢাকা-৭ এর জলাবদ্ধতার অন্ধকার: প্রকল্প, ব্যয়, সময়সীমা ও দায় কার?”







