যশোর জেলার অন্তত ২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংকটে কার্যত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের প্রতিটিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ জনের নিচে। এমনকি কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক অঙ্কেই ঠেকেছে। বিদ্যালয়গুলোতে ৩ থেকে ৬ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য।
মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর মধ্যপাড়া শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে পাঠদান চলছে। কেশবপুরের ময়নাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১২ জন। অভয়নগরের হরিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সংখ্যা ১৫ জনে এসে ঠেকেছে। ২০১৩ সালে এসব প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হলেও বর্তমানে এগুলো শিক্ষার্থী সংকটে ধুঁকছে।
যশোর শহরের লালদিঘিরপাড় এলাকার মসজিদ মহল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাস্তব চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। বিদ্যালয়টিতে মোট শিক্ষার্থী ২৫ জন। সম্প্রতি সেখানে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষা চলাকালে দেখা গেছে, একটি কক্ষে মাত্র ৬ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রমা রানী চক্রবর্তী বলেন, “একসময় নিষিদ্ধ পল্লী ও হরিজন পল্লীর শিশুরা এখানে পড়ত। এখন এসব পরিবার স্থানচ্যুত হওয়ায় শিক্ষার্থী কমে গেছে। আশপাশের বস্তিগুলো উচ্ছেদ হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।”
হরিশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র রায় বলেন, “স্কুলটির আশপাশে জন্মহার কম। আবার আশেপাশেই আরও দুটি বিদ্যালয় থাকায় শিক্ষার্থী সংখ্যা কমছে।”
একই অবস্থা কেশবপুরের ময়নাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। প্রধান শিক্ষক কার্তিক চন্দ্র কুশারী বলেন, “বিদ্যালয়টি বছরের বড় অংশ সময় জলাবদ্ধ থাকে। ফলে শিশুরা স্কুলে আসতে পারে না। তাছাড়া এই এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা বেশি, এবং এখানে জন্মহারও তুলনামূলকভাবে কম।”
অভিযোগ রয়েছে, কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত পাঠদান না করেও বেতন নিচ্ছেন। শিক্ষার্থী না থাকায় ক্লাস কার্যক্রমও অনেক সময় স্থবির হয়ে পড়ে।
এদিকে, চৌগাছার এক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “গ্রামাঞ্চলে অনেক অভিভাবক অনুমোদনহীন মাদ্রাসায় সন্তানদের ভর্তি করছেন। ফলে সরকারি বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী হারাচ্ছে।”
যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আশরাফুল আলম জানান, “৫০ জনের কম শিক্ষার্থী রয়েছে এমন বিদ্যালয়ের তালিকা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এগুলোকে পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের সঙ্গে একত্র করার প্রস্তাব রয়েছে। এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে অধিদপ্তর।”
তিনি আরও বলেন, অনেক বিদ্যালয় স্থাপনের সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হয়নি। জন্মহার কম, জনবসতি কম, আবার কাছাকাছি একাধিক স্কুল থাকায়ও শিক্ষার্থী সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তিকে টিকিয়ে রাখতে শিক্ষার্থী সংকটে পড়া বিদ্যালয়গুলো নিয়ে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। নতুবা সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।