ঢাকা: দীর্ঘদিনের বিতর্ক, মানবাধিকার অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন—র্যাবের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটিয়ে নতুন বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি)-এর যাত্রা শুরু হয়েছে। সংসদে এসআরবি বিল পাসের পর ১৫ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন বাহিনী আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে।
কিন্তু র্যাবের অধ্যায় শেষ হলেও এর উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন শেষ হয়নি। বিশেষ করে র্যাবের জনবল, সম্পদ, স্থাপনা, নথিপত্র, অর্থ ও দায়দেনার বড় অংশ নতুন বাহিনীতে স্থানান্তরের বিধান থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে এসআরবিকে কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে—এ প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে।
ফলে নতুন বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু নতুন নাম, নতুন পোশাক বা নতুন লোগো নয়; বরং কার্যক্রমে কতটা স্বচ্ছতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়—সেটিই।
নাম বদল, নাকি কাঠামোগত পরিবর্তন?
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, র্যাবের বিলুপ্তির পর প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা ধরে রাখতেই এসআরবি গঠন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেছেন, নতুন বাহিনীর সঙ্গে বিলুপ্ত র্যাবের সাংগঠনিক সংযোগ নেই এবং নতুন কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সমালোচকদের প্রধান প্রশ্ন—যদি র্যাবের জনবল ও সম্পদের বড় অংশই নতুন বাহিনীতে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক মহল এটিকে কতটা সম্পূর্ণ নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখবে?
সংসদে বিল পাসের সময় বিরোধী সদস্যরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, নতুন বাহিনীটি ভিন্ন নামে র্যাবের ধারাবাহিকতায় পরিণত হতে পারে।
আইন অনুযায়ী র্যাবের ক্ষমতা, স্থাপনা, তহবিল, জনবল, সম্পদ ও দায়দেনা এসআরবিতে স্থানান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী কিছু বিভাগীয় ও আদালত-সংক্রান্ত কার্যক্রম বহাল রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে মূল প্রশ্ন হতে পারে—প্রতিষ্ঠানের নাম বদলেছে, নাকি প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সংস্কৃতিও বদলেছে?
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার নজির কী বলছে?
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কাঠামোয় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, কার্যক্রম, সম্পৃক্ততা ও পূর্ববর্তী রেকর্ড গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে র্যাব ও এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, একটি বাহিনীর নাম বা সাংগঠনিক পরিচয় পরিবর্তিত হলেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের OFAC-এর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা নথিতে একই রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইউনিট, কর্মকর্তা ও সংস্থাকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার নজির রয়েছে।
তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এসআরবির ভবিষ্যৎ মূল্যায়নেও শুধু নাম পরিবর্তন নয়—কমান্ড কাঠামো, নিয়োগ ও পদায়ন, তদন্ত পদ্ধতি, আটক ও অভিযান পরিচালনার নিয়ম, অভিযোগ তদন্ত, বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং আদালতের তদারকি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মানবাধিকার ও জবাবদিহিই বড় পরীক্ষা
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের অভিযোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। নতুন এসআরবি সেই অতীত থেকে কীভাবে আলাদা হবে—এটি এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য অন্যতম বড় প্রশ্ন।
সংসদীয় কমিটির আলোচনাতেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর অতীতের অপব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এবং প্রশিক্ষণ, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনি কাঠামোতে অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ব্যবস্থার বিষয়ও রাখা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নতুন বাহিনীকে আরও আধুনিক, পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থাগুলো কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, অভিযোগ উঠলে কত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হবে এবং দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তার ওপরই এসআরবির বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
পুরোনো জনবল, নতুন পোশাক—সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই
এসআরবির নতুন লোগো, পতাকা, মনোগ্রাম ও ইউনিফর্ম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে বলে বাহিনীটির মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ জানিয়েছেন। তিনি সদস্যদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সততা ও আইনের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু বাহ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সংস্কার কতটা হচ্ছে—সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের কাছে বড় বিষয়।
কারণ একটি বিশেষায়িত বাহিনীর ভাবমূর্তি কেবল তার পোশাক বা লোগো দিয়ে তৈরি হয় না। অভিযান পরিচালনার ধরন, আটক ব্যক্তির অধিকার, জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি, তদন্তের স্বচ্ছতা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত—এসবই শেষ পর্যন্ত একটি বাহিনীর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
আন্তর্জাতিক মহলের নজর কি থাকবে?
র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতের অভিযোগ এবং ২০২১ সালের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে নতুন বাহিনী শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন পর্যবেক্ষক।
তবে এসআরবিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বরং আগামী দিনগুলোতে বাহিনীটির কার্যক্রম, মানবাধিকার রেকর্ড, জবাবদিহি ব্যবস্থা এবং সরকারের সংস্কার বাস্তবায়নের ধরন পর্যবেক্ষণ করেই আন্তর্জাতিক অংশীদাররা অবস্থান নির্ধারণ করবে—এমনটাই যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ।
সামনে তিনটি বড় পরীক্ষা
এসআরবির সামনে এখন অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—
প্রথমত, র্যাবের অতীতের বিতর্ক থেকে নতুন প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আলাদা করা হবে।
দ্বিতীয়ত, অতীতের অভিযোগে অভিযুক্ত বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ সদস্যদের বিষয়ে কী ধরনের যাচাই-বাছাই ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকবে।
তৃতীয়ত, নতুন বাহিনীর অভিযান ও ক্ষমতা প্রয়োগে কতটা স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করা হবে।
এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন দৃশ্যমান হলে এসআরবি তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় তৈরি করতে পারবে। আর পরিবর্তন যদি কেবল নাম, পোশাক ও লোগোতেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পুরোনো বিতর্ক নতুন প্রতিষ্ঠানের পেছনেও ছায়ার মতো থেকে যেতে পারে।
শেষ কথা
র্যাবের অধ্যায় শেষ হয়েছে—কিন্তু তার উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা শেষ হয়নি। এসআরবি এখন এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে নতুন নামের সঙ্গে নতুন আস্থাও অর্জন করতে হবে।
সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—নতুন বাহিনীকে শুধু অপরাধ দমনের সক্ষমতায় নয়, আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মানদণ্ডেও নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করা।
কারণ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সম্ভবত শুধু ‘র্যাবের নাম কী হয়েছে?’—এতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রশ্ন উঠবে—‘নতুন বাহিনীটি বাস্তবে কীভাবে কাজ করছে?’
আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এসআরবি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায় হয়ে উঠবে, নাকি র্যাবের পুরোনো বিতর্কের নতুন পর্ব হিসেবে আন্তর্জাতিক নজরদারির মুখোমুখি হবে।






