নেত্রকোনার মোহনগঞ্জসহ বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশীয় মিঠাপানির মাছ। ইতোমধ্যে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় মহাশোল মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একইসঙ্গে চিতল, বাঘাই, বানেহর, বাউশ, শিলুন, রিটা, রাণী, কাজলী, বাচাসহ বেশ কয়েকটি দেশীয় মাছও বিলুপ্তির পথে। মাঝে মধ্যে নদী বা বিলে এসব মাছের দেখা মিললেও আগের মতো প্রজনন ও বিচরণ আর নেই।
স্থানীয় জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক যুগ আগেও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন, খালিয়াজুড়ি এবং পার্শ্ববর্তী সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর, দিরাই ও তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন নদী, খাল-বিল ও হাওরে এসব দেশীয় মাছ প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়ত। এসব মাছ মোহনগঞ্জের মৎস্য আড়তে এনে বিক্রি করা হতো। ঢাকার শ্যামবাজার, কারওয়ান বাজার, রামপুরাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা এসব মাছ কিনে নিয়ে যেতেন।
তবে গত ১০-১২ বছরে ধীরে ধীরে এসব মাছের প্রাপ্যতা কমতে থাকে। বর্তমানে অনেক প্রজাতির মাছ হাওরে প্রায় দেখাই যায় না।
স্থানীয় মৎস্য আড়তদারদের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরে আড়তে মহাশোল মাছের দেখা মেলেনি। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে চার কেজি ওজনের একটি মহাশোল মাছ আড়তে উঠেছিল। সে সময় প্রতি কেজি চার হাজার টাকা দরে মাছটি কিনে নিয়েছিলেন স্থানীয় এক সংসদ সদস্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এত সুস্বাদু ও মূল্যবান মাছ বিলুপ্তির পথে চলে গেলেও দেশীয় মাছ সংরক্ষণে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হাওরের জীববৈচিত্র্য থেকে আরও অনেক দেশীয় মাছ হারিয়ে যেতে পারে।
সত্তরোর্ধ্ব জেলে মোহনগঞ্জের সুখদেবপুর গ্রামের সৈলেন বর্মন বলেন, হাওরের নদ-নদীর গভীরতা দিন দিন কমে যাচ্ছে। খাল-বিলগুলো ভরাট হয়ে অনেক জায়গা উঁচু জমিতে পরিণত হচ্ছে। বর্ষায় ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বালু ও পলি এসে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন নদী-বিল ভরাট হচ্ছে। আবার পাঁচগাঁও পাহাড় থেকে কলমাকান্দা হয়ে নেত্রকোনার বিভিন্ন নদী ও বিলে পলি এসে জমছে। ফলে গভীর পানির ওপর নির্ভরশীল দেশীয় মাছের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। প্রায় অর্ধশত প্রজাতির দেশীয় মাছ গভীর পানিতে বিচরণ ও প্রজনন করে। পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় এসব মাছ ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
মোহনগঞ্জ মৎস্য আড়তদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আঙ্গুর মিয়া বলেন, বিভিন্ন কারণে হাওরের দেশীয় মাছ কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছের পোনা ও ছোট মাছ নিধন, গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে মাছ ধরা এবং নদ-নদীর গভীরতা কমে যাওয়া অন্যতম কারণ।
মোহনগঞ্জ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াদ মিয়া বলেন, হারিয়ে যাওয়া দেশীয় মাছ রক্ষায় সরকারের গবেষণা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। হাওরের অত্যন্ত সুস্বাদু ও জনপ্রিয় অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব মাছ শুধু খাবার নয়, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদও।
স্থানীয়দের মতে, হাওরে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিকভাবে বিপুল পরিমাণ মাছ উৎপাদন ও আহরণ হয়। কিন্তু নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার, গ্যাস ট্যাবলেট দিয়ে মাছ শিকার, চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং মাছের প্রজননক্ষেত্রগুলো অনিরাপদ হয়ে পড়ায় দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিক রহমান বলেন, চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার, নদী শুকিয়ে মাছ ধরা এবং বিলের পানিতে গ্যাস ট্যাবলেট ব্যবহার করে মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিছু অসাধু ব্যক্তি এসব পদ্ধতি ব্যবহার করায় হাওরে মাছের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এ বছর উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একাধিক অভিযান চালিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ জাল ও ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি হাওরের নদী-খাল খনন করে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত করা গেলে হারিয়ে যাওয়া দেশীয় মাছ আবারও ফিরে আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, হাওরের দেশীয় মাছ রক্ষায় শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। মাছের প্রজনন মৌসুমে অভয়াশ্রম সংরক্ষণ, নদী-খাল পুনঃখনন, ক্ষতিকর জাল ও বিষাক্ত উপাদান ব্যবহার বন্ধ, কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে গবেষণা ও কৃত্রিম প্রজননের উদ্যোগ নিতে হবে।
হাওরের মিঠাপানির দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার, মৎস্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, জেলে ও হাওরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।







