বাংলাদেশে বেড়াতে এসে মৃত্যুবরণ করা ভারতীয় পাসপোর্টযাত্রী গৌতম মিস্ত্রি (৫৫)-এর মরদেহ ভারতীয় দূতাবাসের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র সম্পন্ন হওয়ার পর বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়েছে।
শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরের দিকে যশোরের বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে গৌতম মিস্ত্রির মরদেহ পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জাহানারা মিস্ত্রি।
বরিশালে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন দম্পতি
জানা গেছে, গত ২২ আগস্ট ভিসা নিয়ে স্বামী গৌতম মিস্ত্রিকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে আসেন জাহানারা মিস্ত্রি। তারা বরিশালে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। প্রায় দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান শেষে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে তারা বেনাপোল স্থলবন্দরে আসেন।
গত বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বেনাপোল চেকপোস্ট এলাকায় পৌঁছানোর পর গাড়ি থেকে নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়েন গৌতম মিস্ত্রি। পরে তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তিনি স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন।
কাগজপত্রের জটিলতায় তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহ নিতে পারেননি স্ত্রী
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মৃত্যুর ঘটনা ঘটায় মরদেহ ভারতে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। মৃত্যুর পরপরই গৌতম মিস্ত্রির স্ত্রী জাহানারা মিস্ত্রির কাছে ডেথ সার্টিফিকেট ও স্থানীয় থানার সাধারণ ডায়েরির (জিডি) কপি ছাড়া প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছিল না।
ফলে সেদিনই স্বামীর মরদেহ নিয়ে ভারতে ফিরতে পারেননি তিনি।
পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল থেকে মৃত্যুসনদ, স্থানীয় থানার জিডির কপি এবং ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র সংগ্রহ করা হয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর শুক্রবার বেনাপোল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ মরদেহ ভারতে নেওয়ার অনুমতি দেয়।
‘বাংলাদেশের মানুষের মানবিকতা কখনো ভুলব না’
স্বামীর মরদেহের সঙ্গে ভারতে ফেরার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে জাহানারা মিস্ত্রি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “দুই সপ্তাহ আগে আমি আমার স্বামী গৌতম মিস্ত্রিকে নিয়ে বাংলাদেশের বরিশালে আমার বাবার বাড়ি ও অন্যান্য আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। দেশে ফেরার সময় বেনাপোলে এসে আমার স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের অংশে আমার স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় বিভিন্ন কাগজপত্রের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরতে পারিনি। প্রায় তিন দিন পর হাসপাতালের ডেথ সার্টিফিকেট, স্থানীয় থানার জিডি এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের ছাড়পত্র সংগ্রহ করে আজ স্বামীর মরদেহ নিয়ে দেশে ফিরছি।”
অর্থসংকটে পাশে দাঁড়ান স্থানীয় মানুষ ও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা
জাহানারা মিস্ত্রি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানকালে তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা-পয়সা ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় মানুষজন তাকে আর্থিক ও মানবিকভাবে সহযোগিতা করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা ছিল না। এ দেশের মানুষ আমাকে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেছেন। স্বামীর মরদেহ গাড়িতে ওঠানো-নামানো থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাজে তারা সহযোগিতা করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বেনাপোল ইমিগ্রেশনের ওসি স্যার এবং স্থানীয় কয়েকজন মানুষও আমাদের জন্য টাকা-পয়সা জোগাড় করে দিয়েছেন। সেই অর্থ দিয়ে ঢাকা যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়াসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে পেরেছি।”
বাংলাদেশের মানুষের এমন মানবিক সহযোগিতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জাহানারা বলেন, “আমার নিজের ভাইকে ফোন করেছিলাম, কিন্তু সে আমাদের দেখতে পর্যন্ত আসেনি। অথচ বাংলাদেশের মানুষ বিপদের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। এ দেশের মানুষের মানবিকতার প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া আমার আর কিছু দেওয়ার নেই।”
ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় সম্পন্ন হয় প্রক্রিয়া
বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুর রহমান জানান, বুধবার স্ট্রোকজনিত কারণে মৃত্যুবরণকারী ভারতীয় পাসপোর্টযাত্রীর মরদেহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও দূতাবাসের ছাড়পত্র পাওয়ার পর শুক্রবার বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, “যেদিন গৌতম মিস্ত্রি মারা যান, সেদিন তার স্ত্রী জাহানারা মিস্ত্রির কাছে ডেথ সার্টিফিকেট ও থানার জিডির কপি ছাড়া প্রয়োজনীয় অন্য কাগজপত্র ছিল না। পরবর্তীতে ভারতীয় দূতাবাসের ক্লিয়ারেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করা হলে বেনাপোল ইমিগ্রেশন থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র দেওয়া হয়।”
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর জাহানারা মিস্ত্রি তার স্বামীর মরদেহ নিয়ে ভারতের উদ্দেশে বেনাপোল চেকপোস্ট অতিক্রম করেন।
কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন গৌতম মিস্ত্রি
মৃত গৌতম মিস্ত্রি ভারতের কলকাতার ৭৮/১, কালিয়নগর, সূর্য সেন পল্লীর বাসিন্দা। তিনি রমনী মিস্ত্রির ছেলে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৫ বছর।
বেনাপোল চেকপোস্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন হয়ে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়।







