খুলনা নগরীর দৌলতপুরে মনিরুল ইসলাম রনি (২৬) নামে এক যুবকের নিখোঁজের চারদিন পর একটি মাছের ঘের থেকে হাত-পা বাঁধা অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজের পরদিনই তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার হয়েছিল। এরপর থেকেই রনির সন্ধান মিলছিল না। অবশেষে ডাকাতিয়া বিলের একটি ঘেরের পানিতে ভেসে ওঠে একটি মরদেহ।
পুলিশ বলছে, মরদেহটি বিকৃত হয়ে যাওয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে পরিবারের সদস্যরা পরনের প্যান্ট ও কোমরের বেল্ট দেখে মরদেহটি রনির বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছেন।
নিখোঁজের পরই মিলেছিল মোটরসাইকেল
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৩ আগস্ট বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হন রনি। একই দিন দৌলতপুর থানায় তার নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরদিন পুলিশ তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। কিন্তু মোটরসাইকেল উদ্ধারের পরও রনির কোনো সন্ধান না পাওয়ায় পরিবারের উদ্বেগ আরও বাড়ে।
মোটরসাইকেলটি কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে রনির সঙ্গে কারও দেখা হয়েছিল কি না এবং নিখোঁজ হওয়ার আগে তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘেরের পানিতে ভেসে উঠল মরদেহ
এরপর বুধবার সকালে মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়া ডাকাতিয়া বিল এলাকার একটি ঘেরে শাপলা তুলতে গিয়ে স্থানীয় এক ব্যক্তি পানিতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন। খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ভিড় জমে যায়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সন্ধ্যায় মরদেহটি উদ্ধার করে।
উদ্ধারের সময় মরদেহটির হাত-পা বাঁধা ছিল। শরীরে পচন ধরায় মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ বিকৃত হয়ে যায়। ফলে চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহের পরনের প্যান্ট ও কোমরের বেল্ট দেখে সেটিকে রনির মরদেহ বলে দাবি করেন।
কে বা কারা রনিকে নিয়ে গিয়েছিল?
রনির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, পরদিন মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং চারদিন পর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ঘের থেকে মরদেহ উদ্ধারের মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
রনিকে বাড়ির সামনে থেকে কেউ তুলে নিয়ে গিয়েছিল কি না, তিনি স্বেচ্ছায় কোথাও গিয়েছিলেন কি না, মোটরসাইকেলটি কোথায় এবং কী পরিস্থিতিতে পাওয়া যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
হত্যার আলামত, নাকি অন্য কোনো রহস্য?
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের কারণে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে রনিকে হত্যা করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে কী কারণে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
মরদেহটি অর্ধগলিত হওয়ায় ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে ময়নাতদন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নিখোঁজের আগে রনির চলাফেরা, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, পরিচিতজনদের সঙ্গে সম্পর্ক এবং মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান ও পরিস্থিতিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের বক্তব্য
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) জাকিয়া সুলতানা বলেন, মরদেহটি বিকৃত থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা পোশাক ও বেল্ট দেখে এটিকে রনির মরদেহ বলে জানিয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
অপরাধ চক্রের অনুসন্ধানী প্রশ্ন
▪ নিখোঁজের পরদিন রনির মোটরসাইকেল কোথায় পাওয়া গিয়েছিল?
▪ বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?
▪ মোটরসাইকেল উদ্ধারের স্থান ও ঘেরের মরদেহ উদ্ধারের স্থানের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি?
▪ হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রনির মরদেহ ঘেরে কীভাবে গেল?
▪ নিখোঁজের ঘটনায় আগে থেকেই কোনো বিরোধ বা হুমকির তথ্য ছিল কি?
▪ রনির মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ও কললিস্টে কী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে?
▪ এই ঘটনায় একা কেউ জড়িত, নাকি এর পেছনে রয়েছে সংঘবদ্ধ একটি চক্র?
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
চারদিনের নিখোঁজ রহস্যের পর ঘেরের পানিতে হাত-পা বাঁধা অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এখন একের পর এক প্রশ্ন সামনে আসছে। রনির নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং শেষ পর্যন্ত ঘেরের পানিতে মরদেহ পাওয়া—পুরো ঘটনাপ্রবাহের যোগসূত্রই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।
দৈনিক অপরাধ চক্রের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে।







