গত বছরের জুলাই মাসে সাভারের আশুলিয়ায় সংঘটিত পাঁচজনকে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা এবং একজনকে জীবিত অবস্থায় আগুনে পোড়ানোর মর্মান্তিক ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ। বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী, এবং তার সঙ্গে রয়েছেন ট্রাইব্যুনালের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক সহিংসতা
রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত একটি রাজনৈতিক জোটের আন্দোলনের সময় আশুলিয়ার একটি এলাকায় সহিংস হামলা চালানো হয়। এই হামলায় পাঁচজন নিরীহ নাগরিককে হত্যা করে তাদের দেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়, এবং আরও একজনকে জীবন্ত অবস্থায় অগ্নিসংযোগ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়।
এই ঘটনা দেশব্যাপী চরম আলোড়ন সৃষ্টি করে। মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই এই নির্মমতা নিয়ে তীব্র নিন্দা জানায়।
সাক্ষ্যগ্রহণের দ্বিতীয় দিন
মামলাটির প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয় গত ১৫ সেপ্টেম্বর। সেখানে রাষ্ট্রপক্ষের দুই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা।
রেজওয়ানুলের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হলেও, সজলের বাবার সাক্ষ্যগ্রহণ এখনও চলমান রয়েছে। আজকের (১৭ সেপ্টেম্বর) দিনে তার সাক্ষ্য জেরা চলবে এবং নতুন আরও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য সাক্ষ্য দিতে পারেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ও মামলার গুরুত্ব
মামলার সূচনা বক্তব্যে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন- আশুলিয়ায় যা ঘটেছে, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়- এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। হত্যার পর লাশ পোড়ানোর মতো ঘটনা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসেও বিরল।
তিনি আরো বলেন- এই মামলায় আমরা শক্ত প্রমাণ ও সাক্ষ্য উপস্থাপন করতে প্রস্তুত। জনগণের কাছে সত্য উদঘাটন করাই আমাদের উদ্দেশ্য।
আসামিপক্ষের প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, তাদের মক্কেলদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। তারা আদালতে পূর্ণ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সাবেক এমপি সাইফুল ইসলাম বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তার আইনজীবীরা দাবি করছেন, তিনি এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন।
পরবর্তী কার্যক্রম ও প্রত্যাশা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মামলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার ওপর জোর দিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা।
পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন শিগগিরই নির্ধারণ করা হবে বলে জানা গেছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা যায়, রাষ্ট্রপক্ষ আরও অন্তত ২৫-৩০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করতে পারে।
মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণ
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই মামলাকে নজিরবিহীন সহিংসতার বিচার হিসেবে দেখছে। ‘সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড রুল অব ল’ নামক একটি সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক বলেন- যদি এই মামলায় দ্রুত ও কার্যকর বিচার হয়, তাহলে এটি রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা হিসেবে কাজ করবে।