বাংলাদেশ বেস্ট পলিটিক্যাল পার্টি (বিবিপিপি) সম্প্রতি তাদের ২৯ দফা ইস্তেহারের আংশিক ঘোষণা দিয়েছে।
এই ইস্তেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে দেশের প্রান্তিক কৃষক, শ্রমজীবী, কর্মজীবী, বিদেশে কর্মরত রেমিটেন্স যোদ্ধা, নারী এবং শিক্ষার্থীদের জীবনমান উন্নয়নে। দলটির দাবি, ক্ষমতায় গেলে দেশের বড় অংশের জনগণ সরাসরি রাষ্ট্রীয় সুবিধার আওতায় আসবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা
বিবিপিপি জানিয়েছে, প্রথম ধাপে ২ কোটি প্রান্তিক কৃষক এবং ৬ কোটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। পরবর্তীতে আরও ৪ কোটি পরিবারকে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। ফলে মোট ৮ কোটি দরিদ্র পরিবার রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা ভোগ করতে পারবে।
পরিবহন ও আবাসন সুবিধা
কর্মজীবী ও প্রমজীবিদের জন্য মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহনে ভাড়া অর্ধেক করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি। শুধু তাই নয়, কর্মজীবীদের থাকার সুবিধার্থে সুলভ মূল্যে সরকারি আবাসনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনাও রয়েছে। ঢাকায় একক ব্যক্তির জন্য মাসিক ১,০০০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫০০ টাকায় ব্যাচেলর থাকার ব্যবস্থা থাকবে। পরিবার নিয়ে থাকলে ঢাকায় ২,৫০০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ১,৫০০ টাকায় সরকারি বহুতল ভবনে থাকার সুযোগ থাকবে।
নারী ও নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্যোগ
ইস্তেহারে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি নারীকে আত্মরক্ষায় সক্ষম করতে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতি বছর নারী দিবসে প্রত্যেক নারীকে সম্মানী প্রদান করা হবে। এ ছাড়া আইনের শাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে সাধারণ নাগরিক পর্যন্ত সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
শ্রমজীবী মানুষের বিনোদন ও কল্যাণ
দলটির দাবি, শ্রমজীবী মানুষরা জীবনের অভাব-অনটনের কারণে কোনো বিনোদন পায় না। তাই তাদের জীবনে অন্তত একবার রাষ্ট্রীয় খরচে পর্যটন স্পটে ভ্রমণের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া যেসব শ্রমিক বা কর্মজীবীর পেনশন বা প্রভিডেন্ট ফান্ড নেই, তাদের বার্ধক্যে রাষ্ট্রীয় পেনশনের আওতায় আনা হবে।
রেমিটেন্স যোদ্ধাদের সুরক্ষা
বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের (রেমিটেন্স যোদ্ধা) বিদেশ যাত্রার খরচ কমানোর জন্য দালালমুক্ত ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সুদমুক্ত ঋণ দেবে এবং পরবর্তীতে শ্রমিকরা কিস্তিতে তা শোধ করবেন।
প্রশাসনিক সংস্কার
ঔপনিবেশিক আমলাতান্ত্রিক চর্চা ভেঙে দেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি থেকে নিম্নপদস্থ কর্মচারী পর্যন্ত কাউকে ‘স্যার’ সম্বোধন করা হবে না। কেবল আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ সম্বোধন ব্যবহার করা যাবে। অফিসে সম্বোধন হবে ‘ভাই’ বা ‘ব্রাদার’।
শিক্ষা খাতে সংস্কার
শিক্ষাকে সহজলভ্য করতে শিক্ষা খরচ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামানোর পরিকল্পনা করেছে বিবিপিপি। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষাকে সবার জন্য উন্মুক্ত করা এবং গবেষণা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। দলটির দাবি, শিক্ষাখাতে বাণিজ্যিকীকরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন
ইস্তেহারে বলা হয়েছে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন করে ৯০ হাজার পুলিশ, ৩০ হাজার আনসার এবং ৩০ হাজার সেনা সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। পুলিশকে উচ্চ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে আরও পেশাদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ ৩,০০০ নতুন জনবল নিয়োগ করা হবে, যারা ছদ্মবেশে কাজ করে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি উদ্ঘাটন করবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও মূল্য স্থিতিশীলতা
অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের উৎপাদনে ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিবিপিপি। চাউল, ডাল, আটা, চিনি, তেল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজ, আলু, আদা, রসুন, সবজি ও মরিচ উৎপাদনে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়া হবে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।
মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার
ইস্তেহারে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাদের যেন আর কারও করুণার পাত্র হতে না হয়, সে দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি খুন, গুম, নির্যাতন ও গণহত্যার সুষ্ঠু বিচার করার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে রূপান্তর
দলটির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দেশে ১০ হাজার নতুন ডাক্তার এবং ৩০ হাজার নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি সম্পূর্ণ নির্মূল করে দরিদ্রদের আস্থার স্থান হিসেবে সরকারি হাসপাতালকে গড়ে তোলা হবে।
বিচার বিভাগের সংস্কার
বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে ৩ হাজার নতুন বিচারক ও ৯ হাজার সহকারী নিয়োগ দেওয়া হবে। দলটির অঙ্গীকার, ৩৬ মাসের বেশি কোনো মামলা চলমান থাকবে না। এছাড়া বিচার প্রক্রিয়ার খরচ কমানো হবে যাতে সাধারণ মানুষ সহজে আইনি সেবা পেতে পারে।
বিবিপিপি’র ইস্তেহার অনুযায়ী, তাদের মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন। দলটি বিশ্বাস করে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ, উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।