বর্তমান সময়ের বাংলাদেশি রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী। একসময়ের বিতর্কিত দলটি এখন আবারও জনপ্রিয়তার ধারায় ফিরছে বলে দাবি করছে বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণ। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়ের পর জামায়াত নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক ও সংবাদমাধ্যমে।
এ নিয়ে একটি বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক প্রভাবশালী দৈনিক এই সময়। অনমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা “পূর্বের হাওয়া: পর্ব ৩— ইসলামি জোট গড়ে জয়ী হতে কি পারবে জামায়াত?” শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের সম্ভাবনার চিত্র।
মার্কিন কূটনীতিকের মন্তব্য
প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কূটনীতিক জামায়াতের জনপ্রিয়তার পেছনে পাঁচটি কারণ তুলে ধরেন:
১. শিক্ষিত ও বাণিজ্যিকভাবে সফল নেতৃত্ব
জামায়াত নেতারা সাধারণত উচ্চশিক্ষিত, এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল। তাদের সংগঠনের মধ্যে একটি পেশাদারিত্ব আছে, যা অনেক রাজনৈতিক দলের অভাবে দেখা যায়।
২. ভদ্রতা ও ব্যবহারে সৌজন্য
ওই কূটনীতিকের মতে, জামায়াত নেতাদের আচরণ ভদ্র ও পরিশীলিত। তারা আলোচনার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে পারেন, যা আন্তর্জাতিক মহলে ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়।
৩. মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হওয়া ইতিহাস
জামায়াত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য দেশে বিতর্কিত হলেও, সাম্প্রতিক ইতিহাসে তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়েছে বলে কূটনীতিকরা মনে করেন।
৪. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস
জামায়াত একটি সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ দল। তারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে আগ্রহী এবং নির্বাচনমুখী রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়।
৫. প্রগতিশীল ইসলামী শক্তি
তালেবান বা আইএস ধাঁচের নয়, বরং জামায়াতকে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ইসলামি দল হিসেবেই দেখেন পশ্চিমা কূটনীতিকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই জামায়াতকে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় দেখতে আগ্রহী। মার্কিন কূটনীতিকের ভাষায়, “যে দেশে ৮০-৮৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান, সেখানে ইসলামি দল সরকারে এলে ক্ষতি কী? জামায়াত একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ দল, তাদেরও একবার সুযোগ পাওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “জনগণ যদি একবার সুযোগ দেয়, আর জামায়াত যদি ব্যর্থ হয়, তবে তারাই ভোটে সরিয়ে দেবে। এটা তো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামায়াত তাদের আগের অবস্থান থেকে অনেকটা কৌশল পরিবর্তন করেছে। আগের মতো প্রকাশ্য ধর্মীয় আগ্রাসী অবস্থানের বদলে এখন তারা মূলধারার রাজনীতিতে, উন্নয়ন ও যুব নেতৃত্বের মাধ্যমে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে চাইছে।
তবে অনেকের মতে, অতীতের ভূমিকার দায় এখনো দলটির কাঁধে রয়ে গেছে। সুতরাং জামায়াতের জন্য ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ যেমন বড়, তেমনি সম্ভাবনাও কম নয়।
নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে। এখন দেখার বিষয়, এই উত্থান কতটা স্থায়ী হয় এবং তারা আদৌ গণমানুষের আস্থা অর্জনে কতটা সফল হতে পারে।