দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত আটটি কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। বিকেল চারটা পর্যন্ত একটানা এই ভোটগ্রহণ চলবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটকেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ব্যালট বাক্স সিলগালা করা হয়, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এবার ডাকসুতে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯,৮৭৪ জন। এর মধ্যে পাঁচ ছাত্রী হলের ১৮,৯৫৯ জন এবং ১৩ ছাত্র হলের ২০,৯১৫ জন শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিচ্ছেন।
ভোটের আমেজ ও শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম কার্জন হলের ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে এসে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ভোট নিয়ে অনুভূতি অনেক বেশি। প্রথমবার ডাকসু নির্বাচনে ভোট দিচ্ছি, আর আমাদের এই ভোটের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেমন হবে।” তিনি আরও জানান, পরীক্ষার আগে হোমওয়ার্ক করার মতো রাত জেগে ৫২৬ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে ৪১ জনকে নির্বাচন করেছেন তারা। রাকিবুলের এই বক্তব্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান সচেতনতা ও আগ্রহের প্রতিফলন।
নির্বাচনের বিস্তারিত তথ্য
এবারের নির্বাচনে ডাকসুতে ২৮টি পদের জন্য মোট ৪৭১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ৬২ জন নারী। পাশাপাশি ১৮টি হল সংসদে ১৩টি করে পদের জন্য মোট ১,০৩৫ জন প্রার্থী লড়ছেন। প্রতিটি ভোটারকে ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ৪১টি ভোট দিতে হবে। ব্যালটের আকারও এবার বড়, ডাকসুর জন্য রয়েছে পাঁচ পৃষ্ঠার ব্যালট এবং হল সংসদের জন্য এক পৃষ্ঠার ব্যালট। ভোটগ্রহণ হচ্ছে অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) শিট পদ্ধতিতে।
শীর্ষ পদগুলোতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট, গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ-সমর্থিত বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ, উমামা ফাতেমার নেতৃত্বাধীন স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য এবং বামপন্থী সাত ছাত্রসংগঠন সমর্থিত প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেলের মধ্যে।
কেন্দ্রের বিন্যাস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
এবারের ডাকসু নির্বাচনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, যা হলো ভোটকেন্দ্রগুলো আবাসিক হলের বাইরে স্থাপন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসের নির্ধারিত আটটি কেন্দ্র হলো:
* কার্জন হল: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলের ভোটারদের জন্য।
* শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্র: জগন্নাথ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীদের জন্য।
* ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি): রোকেয়া হলের ছাত্রীদের জন্য।
* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কেন্দ্র: বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থীদের জন্য।
* সিনেট ভবন: স্যার এ এফ রহমান হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীদের জন্য।
* উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র: সবচেয়ে বেশি ভোটার, মাস্টারদা’ সূর্যসেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, শেখ মুজিবুর রহমান হল ও কবি জসীমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থীদের জন্য।
* ভূতত্ত্ব বিভাগ কেন্দ্র: কবি সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীদের জন্য।
* ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র: শামসুন নাহার হলের ছাত্রীদের জন্য।
নির্বাচন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।